চট্টগ্রামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসন—ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম-২) ও সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম-৪)—নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে চলমান আইনি জটিলতার কারণে উন্নয়ন কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকলেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় তারা এখনো শপথ নিতে পারেননি। ফলে সংসদ সদস্যদের অনুকূলে বরাদ্দ হওয়া বিশেষ উন্নয়ন তহবিল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দুই উপজেলার লাখো মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধ ও আদালতে চলমান মামলা-মোকদ্দমার কারণে উন্নয়নের গতি থমকে গেছে। দেশের অন্যান্য এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বরাদ্দ তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের জন্য টিআর (টেস্ট রিলিফ) কর্মসূচির আওতায় মোট ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় আরও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বরাদ্দ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে এলাকাবাসী। এছাড়া ১১২ মেট্রিক টন চাল এবং ১১২ মেট্রিক টন গমের বরাদ্দও এখনো আটকে রয়েছে।
এসব বরাদ্দের মাধ্যমে সাধারণত গ্রামীণ সড়ক সংস্কার, খাল-নালা পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন ছোট ও মাঝারি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে এসব প্রকল্প অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বলেন, “নিয়মিত সরকারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।”
একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সর্বশেষ টিআর, কাবিটা ও কাবিখা কর্মসূচির কোনো বরাদ্দ আমাদের উপজেলায় আসেনি। এসব বরাদ্দের মাধ্যমে সাধারণত অনেক ছোট উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এবার সেসব প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।”
তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো আসনে সংসদ সদস্য না থাকলেও উন্নয়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। সরকারের প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে বিকল্প উপায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব।
সাবেক স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, “কোনো নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্য না থাকলেও সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কথা নয়। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিজস্ব প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে এমপিদের সুপারিশভিত্তিক বিশেষ বরাদ্দ বা এলাকাভিত্তিক কিছু তহবিলের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।”
এদিকে উন্নয়ন বরাদ্দ না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। সীতাকুণ্ডের বাসিন্দা মো. একরাম বলেন, “নেতাদের বিরোধ বা আইনি লড়াই যাই হোক, তার প্রভাব কেন আমাদের ওপর পড়বে? সারা দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, অথচ আমাদের এলাকায় কোনো বরাদ্দ আসছে না। আমরা উন্নয়ন চাই।”
অন্যদিকে দুই আসনের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে রয়েছে এলাকাবাসী। সীতাকুণ্ড আসনে নির্বাচিত আসলাম চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন জানান, গত ১৫ জুন আপিল বিভাগে শুনানি হয়েছে। প্রার্থিতা নিয়ে করা আপিলের রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৩০ জুন দিন ধার্য করা হয়েছে। একইসঙ্গে স্থগিত থাকা ফলাফল প্রকাশের বিষয়েও আদালত নির্দেশনা দিতে পারেন।
ফটিকছড়ি আসনে নির্বাচিত সারোয়ার আলমগীরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, আপিল বিভাগ তার প্রার্থিতা-সংক্রান্ত রুল দুই সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফলাফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণ কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
ফলে উন্নয়নের প্রত্যাশায় থাকা ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডের লাখো মানুষের চোখ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে। আইনি জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত গেজেট প্রকাশ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নের চাকা আবার সচল হবে—এমন প্রত্যাশাই এলাকাবাসীর।
পড়ুন:চুক্তির প্রভাবে বিশ্ববাজারে কমলো জ্বালানি তেলের দাম
দেখুন:সুন্দরবনের শেলা নদীতে কুমিরের আ/ক্র/ম/ণে নারীর মৃ/ত্যু
ইমি/


