একটি সালিশ বৈঠক। উপস্থিত কয়েকশ মানুষ। বিচার কার্যক্রম চলছিল স্বাভাবিকভাবেই। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন সালিশ পরিচালনাকারী সংসদ সদস্য। টেবিল চাপড়ে উচ্চস্বরে ধমক দিতে দেখা যায় তাকে। মাত্র এক মিনিটের সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালার এমন একটি ভিডিও শনিবার (২০ জুন) সকাল থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে তাকে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে উত্তেজিত ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়।
ভিডিওতে এমপি হানজালাকে বলতে শোনা যায়, “কথা বললেন কেন? আপনারা এখানে কাউন্টার দিলেন কেন?” এরপর টেবিল চাপড়ে তিনি বলেন, “এই মিয়া চুপ করেন, একেবারে খেয়ে ফেলবো। চুপ করেন। আমি আসছি বিচার করার জন্য। কাউন্টার দিলে আমি দিবো।”
ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধির এমন আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য—তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
যে সালিশ থেকে শুরু বিতর্ক স্থানীয় সূত্র জানায়, ঘটনাটি প্রায় এক মাস আগের। শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া এলাকায় বিএনপির কর্মী তারামিয়াকে ঘিরে আয়োজিত একটি সালিশ বৈঠকে এ ঘটনা ঘটে। বৈঠকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী তারামিয়া দাবি করেন, বিচার চলাকালে তার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। তার অভিযোগ, সালিশে অন্যদের বক্তব্য শোনার সুযোগ না দিয়ে একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “আমি এর প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যেখানে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে সালিশ অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে বিচার নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত আসতেই পারে। একজন বিচারকের দায়িত্ব হলো সেসব কথা ধৈর্যের সঙ্গে শোনা।”
তার মতে, মানুষের মতামত শোনার সুযোগ না থাকলে সেটি জনসম্মুখের সালিশ না হয়ে একতরফা বিচারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে একপর্যায়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখনই মেজাজ হারান সংসদ সদস্য হানজালা। ওই সময় সালিশে উপস্থিত একজন ব্যক্তি মোবাইল ফোনে পুরো ঘটনা ধারণ করছিলেন। এক পর্যায়ে ভিডিও ধারণ বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হলে ভিডিওটির সমাপ্তি ঘটে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।
ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিক্রিয়া আসতে শুরু করেছে।মাদারীপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, “একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে আরও সংযত ও ধৈর্যশীল আচরণ প্রত্যাশিত। জনসম্মুখে এমন ভাষা ও আচরণ নেতিবাচক বার্তা দেয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে জনসম্মুখে জনপ্রতিনিধিদের প্রতিটি বক্তব্য ও আচরণ দ্রুত জনমতের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তিদের সংযম ও সহনশীলতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমদ হানজালার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে ভাইরাল ভিডিও ও অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ঘিরে আলোচনা এখনো থামেনি। একটি সালিশ বৈঠকের সেই মুহূর্তই এখন শিবচরসহ পুরো মাদারীপুরের রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।
পড়ুন- শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগই জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ: প্রধানমন্ত্রী


