রাজধানীর খিলক্ষেতের অভিজাত আবাসিক এলাকা নিকুঞ্জ-২-এ তীব্র জনদাবির মুখে অবশেষে এক বিশাল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)।
আজ রোববার দুপুরে পরিচালিত এই বিশেষ অভিযানে এলাকার ১/এ নম্বর সড়কের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত গড়ে ওঠা সব ধরনের অবৈধ ও অননুমোদিত স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে রাখা এসব অবৈধ কাঠামোর কারণে ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
ডিএনসিসির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা আক্তার নেলির প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতিতে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়।
ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে তাদের যে নিয়মিত অভিযান, এটি তারই অংশ। তবে নিকুঞ্জ-২ এলাকার ১/এ নম্বর সড়কটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অসন্তোষ ও ধারাবাহিক লিখিত অভিযোগ ছিল। আজ দুপুরের এই ঝটিকা অভিযানে সড়ক ও জনসাধারণের চলাচলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা স্থায়ী-অস্থায়ী সব ধরনের পাকা-কাঁচা দোকানপাট, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও শেড সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ডিএনসিসির উচ্ছেদ দল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগ, নিকুঞ্জ-২ এর ১/এ নম্বর সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে শুধু অবৈধ দখলদারিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা অপরাধের এক নিরাপদ চারণভূমিতে পরিণত হয়েছিল। জনবহুল এই আবাসিক এলাকার ভেতরে ফুটপাত ও সড়ক সংকুচিত করে গড়ে তোলা অস্থায়ী ঘরগুলো মাদকসেবী ও নানাবিধ অসামাজিক
কর্মকাণ্ডের প্রধান আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। বিশেষ করে রাতের অন্ধকার নামার সাথে সাথেই সড়কটির বিভিন্ন অংশ মাদক ব্যবসায়ী, ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর অবাধ আড্ডাস্থলে রূপ নিত। এর ফলে এই পথ দিয়ে যাতায়াতকারী সাধারণ পথচারী, বিশেষ করে কর্মজীবী নারী, স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী ও শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছিল। এর আগে নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সড়ক, লেক, ফুটপাত ও সার্বিক আবাসিক পরিবেশ নির্বিচারে দখল এবং সেখানে নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা নিয়ে জাতীয় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে একাধিক অনুসন্ধানী ও ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সে সব প্রতিবেদনে আবাসিক এলাকার চরিত্র নষ্ট হওয়া, ফুটপাত সংকুচিত হওয়া এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিকল্পিত নগরায়ণের মহৎ উদ্দেশ্য কীভাবে ব্যাহত হচ্ছে, তা অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। আজকের এই দুপুরের সময়োচিত অভিযানের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে দীর্ঘদিনের জমে থাকা আতঙ্ক ও শঙ্কা কেটে গেছে এবং গোটা এলাকায় এক স্বস্তিদায়ক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
এই উচ্ছেদ অভিযানকে স্বাগত জানিয়ে এবং দীর্ঘদিনের জনদাবির পক্ষে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করে নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক জাহিদ ইকবাল বলেন, “আজকের এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল কিছু ইট-পাথর বা টিনের অবৈধ স্থাপনা ভেঙে ফেলার সাধারণ কোনো ঘটনা নয়; এটি আসলে আমাদের প্রিয় আবাসিক এলাকা থেকে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অন্ধকার দূর করার একটি যুগান্তকারী অভিযান। দীর্ঘদিন ধরে ১/এ নম্বর সড়কটি একশ্রেণির প্রভাবশালী দখলদার ও অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছিল। আমাদের মা-বোনেরা এই পথ দিয়ে দিনের আলোতেও চলতে ভয় পেতেন, আর রাতের কথা তো বাদই দিলাম। আমরা সবাই মিলে একটি আধুনিক, সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত, অনাকাঙ্ক্ষিত দখলমুক্ত এবং নিরাপদ-টেকসই নিকুঞ্জ গড়তে চাই। আজ জনগণের সেই প্রাণের দাবি বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তবে ডিএনসিসি ও প্রশাসনের কাছে আমাদের অনুরোধ, এই উচ্ছেদ যেন সাময়িক না হয়। অতীতেও এমন হয়েছে যে, উচ্ছেদের কয়েকদিন পর পুনরায় কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এই সড়ক ও ফুটপাত দখল করে নিয়েছে। তাই এবার যেন শক্ত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে জনগণের এই স্বস্তি স্থায়ী ও টেকসই রূপ লাভ করে।”
অভিযানের পর নিকুঞ্জ এলাকাকে অপরাধমুক্ত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “অবৈধ স্থাপনাই অপরাধীদের আস্তানা। আজকের উচ্ছেদের পর এই সড়ককে আমরা আর কখনোই অপরাধের অভয়ারণ্য হতে দেব না। এলাকাকে সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত ও নিরাপদ করতে পুলিশের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত টহল অব্যাহত থাকবে। কোনো দখলদার বা অপরাধীকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না; জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
আজ দুপুরে অভিযান চলাকালে শত শত স্থানীয় বাসিন্দা রাস্তায় নেমে আসেন এবং ডিএনসিসির এই সাহসী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে স্বাগত জানান। অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্ছেদকারী দলকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করেন। তবে স্বস্তির পাশাপাশি স্থানীয়দের মনে এক ধরনের শঙ্কাও কাজ করছে।
বাসিন্দারা জানান, এর আগেও নিকুঞ্জ-২ এলাকার বিভিন্ন সড়ক দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে যথাযথ তদারকি ও প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে আবারও তা পূর্বের নোংরা ও বিপজ্জনক রূপে ফিরে যায়।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী এবার উচ্ছেদের পর পুনরায় যাতে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা কুচক্রী গোষ্ঠী সড়ক ও ফুটপাত দখল করতে না পারে, সে বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ ও সার্বক্ষণিক কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

