দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট ও আর্থিক জটিলতা কাটিয়ে আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে ফিরছে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প। সেই প্রত্যাবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছে চট্টগ্রামের পটিয়াভিত্তিক ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। প্রতিষ্ঠানটির নির্মিত তিনটি অত্যাধুনিক ল্যান্ডিং ক্রাফট আগামী সেপ্টেম্বর মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি হতে যাচ্ছে, যা দেশের জাহাজ নির্মাণ খাতের জন্য নতুন আশার বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কর্ণফুলী নদীর তীরে ৩৪ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা ওয়েস্টার্ন মেরিন একসময় বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অন্যতম সফল প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন জাহাজ নির্মাণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের সক্ষমতার পরিচয় তুলে ধরেছিল।
তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, ডলার সংকট এবং ব্যাংক ঋণের চাপের কারণে গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমেও। একসময় দেশের সম্ভাবনাময় এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
সব বাধা অতিক্রম করে বর্তমানে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারওয়ান শিপিং লিমিটেডের জন্য নির্মিত তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফটের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ‘মায়া’, ‘এসএমএস এমি’ ও ‘মুনা’ নামের জাহাজগুলো আগামী সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে রপ্তানি করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিটি জাহাজের দৈর্ঘ্য ৬৯ মিটার এবং প্রস্থ ১৬ মিটার। অফশোর সাপ্লাই ও গভীর সমুদ্রে পণ্য পরিবহনের উপযোগী করে নির্মিত এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক ক্ল্যাসিফিকেশন সংস্থা ব্যুরো ভেরিটাসের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানে ওয়েস্টার্ন মেরিনে ১৫টি জাহাজ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য দুটি অয়েল ট্যাংকার ও দুটি ল্যান্ডিং ক্রাফট, নরওয়ের জন্য একটি ফিশিং ভেসেল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য দুটি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের জন্য আটটি কার্গো ভেসেল রয়েছে।
২০০৮ সালে ডেনমার্কে প্রথম জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে যাত্রা শুরু করে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এরপর জার্মানি, নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড, কেনিয়া, ভারত ও ইকুয়েডরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাহাজ রপ্তানি করে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করে।
প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত বিশ্বের ১২টি দেশে মোট ৩৯টি জাহাজ রপ্তানি করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এসব রপ্তানি থেকে বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ১৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া দেশীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মালিকদের জন্য শতাধিক বিভিন্ন ধরনের জলযান নির্মাণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে অর্থায়ন এবং পর্যাপ্ত চলতি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প আবারও বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। সেই সম্ভাবনার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠতে পারে ওয়েস্টার্ন মেরিনের এই নতুন রপ্তানি উদ্যোগ।
প্রায় এক হাজার দক্ষ কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও শ্রমিকের সমন্বয়ে পরিচালিত শিপইয়ার্ডটিতে রয়েছে আধুনিক অবকাঠামো ও পাঁচটি স্লিপওয়ে। দীর্ঘ সংকট কাটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরার প্রত্যাশা এখন প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট সবার।
পড়ুন : শতভাগ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর প্রত্যয় কলমাকান্দায়


