বিজ্ঞাপন

ইয়া হোসেন’ ধ্বনিতে মুখর সৈয়দপুর, ৭৫ বছরের ঐতিহ্যে পবিত্র আশুরার বর্ণাঢ্য আয়োজন

নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে দশ মহররম তথা পবিত্র আশুরা উপলক্ষে দিনব্যাপী শোক, ধর্মীয় আবেগ, ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য আবহের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৭৫ বছরের ঐতিহ্য ধরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম তাজিয়া মিছিল, প্রতীকী কারবালা, লাঠিখেলা, তলোয়ার ও আগুনের নানা প্রদর্শনীকে ঘিরে উৎসুক মানুষের ঢল নেমেছে পুরো শহরে। আশুরার এ ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে প্রতিবছরের মতো এবারও আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো মানুষ ছুটে এসেছেন সৈয়দপুরে।

আজ শুক্রবার (২৬ জুন) বিকেলে শিয়া ও সুন্নি সম্প্রদায়ের অনুসারীরা শহরের কাজিরহাট ঈদগাহ মাঠ থেকে শোক মিছিল ও তাজিয়া শোভাযাত্রা বের করেন। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে হাতিখানা কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালায় গিয়ে সমবেত হয়। এ সময় ঢোলের তালে তালে অংশগ্রহণকারীরা দুই হাত দিয়ে বুকে আঘাত করে ‘ইয়া হোসেন, ইয়া হোসেন’ ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন পুরো এলাকা। অনেককে অঝোরে কাঁদতে এবং কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার স্মরণে মাতম গীত গাইতে দেখা যায়।

সৈয়দপুর হাতিখানায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার আয়োজক কমিটির সদস্য ফিরোজ জানান, মহররমের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় এর আনুষ্ঠানিকতা। প্রতিটি ইমামবাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। মহররমের সপ্তম দিনে কেন্দ্রীয় কারবালা থেকে পবিত্র মাটি সংগ্রহ করে শহরের প্রতিটি ইমামবাড়ায় নিয়ে যান খলিফারা। বিশেষ নিয়মে সেই মাটি একটি পাত্রে তাজিয়ার নিচে সংরক্ষণ করা হয়। এরপর তাজিয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ফাতেহা পাঠ, নিশান চড়ানো এবং অন্যান্য রীতিনীতি পালন।

মহররমজুড়ে শহরে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। তারা ইমামবাড়ায় এসে দোয়া পড়েন, মানত করেন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আশুরার দিন যে স্থান থেকে মাটি আনা হয়েছিল, শোকাবহ মিছিলের মাধ্যমে পুনরায় সেখানে তা রেখে আসা হয়। এটিও এ আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষঙ্গ।”

মহররম কমিটির অন্যতম সদস্য শাহিদ চিশতী জানান, বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে পাইকওয়ালারা তিন দিন ধরে প্রতীকী ‘দুলদুল’ সেজে মানত পালন করেন। চাঁদ দেখার পর প্রতীকী কারবালার মাটি প্রতিটি ইমামবাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং আশুরার দিন তা ফেরত এনে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে।

শোক মিছিলে অংশ নেওয়া অনেকের শরীর রঙিন রশি, জরির ফিতা ও ছোট ছোট ঘণ্টির মালা দিয়ে সজ্জিত ছিল। মাথা সাদা ও সবুজ কাপড়ে আবৃত, হাতে লাল, সবুজ ও সাদা রঙের পতাকা। হাজার হাজার মানুষের ঢলে কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার পুরো এলাকা পরিণত হয় জনসমুদ্রে; তিল ধারণেরও ঠাঁই ছিল না। পরে বিশেষ মোনাজাতের মধ্য দিয়ে সুন্নি সম্প্রদায়ের একটি অংশের আশুরার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।

আশুরা উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, তলোয়ার খেলা ও আগুনের বিভিন্ন প্রদর্শনী। প্রতিটি ইমামবাড়ায় সারারাত ঢোলের বাদ্য, কাসিদা পাঠ, তাজিয়া মিছিল, পাইকবাধা, ফাতেহা পাঠ ও নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখর থাকে পুরো শহর। অনেক স্থানে বসে মেলা, আবার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কাসিদা পাঠের ঝরনা আসরও অনুষ্ঠিত হয়। ঢোলের তালে আর ‘ইয়া হোসেন’ ধ্বনিতে রাতভর যেন নির্ঘুম থাকে সৈয়দপুর।

সৈয়দপুরের আশুরা আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বিভিন্ন ইমামবাড়ায় মানত ও ফাতেহা দিতে মুসলমানদের পাশাপাশি অমুসলিমদেরও উপস্থিতি দেখা যায়। শহরের রসুলপুর ইমামবাড়ায় ফাতেহা দিতে আসা অমুসলিম নারী গীতা রানী বলেন, “ইমাম হোসেন শুধু মুসলমানদের নন, তিনি মানবতার প্রতীক। তাঁর আদর্শ আমরা সবাই লালন করি। তাই প্রতি বছর এখানে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।”

এদিকে পুরো আয়োজনকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। শহরের ৫০টিরও বেশি ইমামবাড়ায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ, টহল টিম ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রেজাউল করিম রেজা বলেন, “অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকা হলেও এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে পুরো শহর ও কারবালার মাঠে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের টহল-ভ্যান, বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হচ্ছে। ফলে এবারও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।”

শোক, ভক্তি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির অনন্য সমন্বয়ে পবিত্র আশুরাকে কেন্দ্র করে সৈয়দপুর প্রতি বছরই পরিণত হয় এক ব্যতিক্রমী মিলনমেলায়, যা দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি বহন করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : কুয়েতে বাংলাদেশী প্রবাসীর রহস্যজনক মৃত্যু, তদন্তে পুলিশ

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন