প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ আট বছর পেরিয়ে গেলেও নিজস্ব কোনো ঠিকানা পায়নি নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ। স্থায়ী ক্যাম্পাস, নিজস্ব হাসপাতাল এবং আবাসন সংকটের কারণে চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম। এই অচলাবস্থা নিরসন এবং অবিলম্বে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের দাবিতে নেত্রকোনায় মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ।
বুধবার (১ জুলাই) দুপুর ১২টায় নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাব চত্বরে ‘নাগরিক অধিকার কমিটি, নেত্রকোনা’ এর উদ্যোগে এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত স্থান নির্ধারণ করে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করা না হলে জেলার ২৫ লক্ষ মানুষকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষার বেহাল দশার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর ইতোমধ্যে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ থেকে দুটি ব্যাচ চিকিৎসক হিসেবে পাস করে বের হয়ে গেছে। অথচ এখনো পর্যন্ত কলেজটির নিজস্ব কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। মেডিকেল কলেজে অধ্যাপকের ১২টি পদের মধ্যে মাত্র ৩টি পদ পূর্ণ আছে। তীব্র শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ক্লিনিক্যাল কার্যক্রম। নিজস্ব কোনো হাসপাতাল ও হোস্টেল ভবন না থাকায় বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আবাসন ও ব্যবহারিক শিক্ষার ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এছাড়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই।

দীর্ঘদিন ধরে নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস নির্মাণ না হওয়ার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ব্যক্তিস্বার্থ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে দায়ী করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ নেত্রকোনা জেলা শাখার সহ-সভাপতি আব্দুল হাদী ফরাজী অভিযোগ করে বলেন, “সরকারের অর্থ বা সদিচ্ছার অভাব নেই, মূল সমস্যা স্থানীয় দ্বন্দ্বে। প্রভাবশালী মহল নিজেদের এলাকায় ক্যাম্পাসটি নিতে চায়, যাতে তাদের এলাকার জমির দাম বাড়ে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়। স্বার্থান্বেষী মহলের টানাটানিতেই আটকে আছে এত বড় একটি প্রকল্প।”
যমুনা টিভির স্টাফ রিপোর্টার ও দৈনিক যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি কামাল হোসাইন জানান, “নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের নামে জায়গার দলিল ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র সম্পন্ন হয়েছিল। বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকার পরও একটি পক্ষ এটি নিয়ে নতুন করে টালবাহানা শুরু করেছে।”
নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা থেকে ৫০ একর জমি মেডিকেল কলেজকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে নেত্রকোনা প্রেসক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক নাজমুস শাহাদাৎ নাজু বলেন, “যেহেতু ইতিমধ্যেই ৫০ একর জায়গা দেওয়া হয়েছে, তাই ওখানেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা উচিত। বর্তমানে সরকারের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে সরকারের প্রচুর অর্থ ব্যয় হবে এবং ফসলি জমিও নষ্ট হবে।”
মানববন্ধনে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা সরকারের দীর্ঘসূত্রতা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদাসীনতার তীব্র সমালোচনা করেন। দৈনিক ইত্তেফাকের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্যামলেন্দু পাল বলেন, “প্রতি বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও মেডিকেল কলেজ স্থাপনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। বিগত সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।”
দৈনিক জননেত্র পত্রিকার সম্পাদক মো. মুখলেছুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কাছ থেকে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে নির্ধারিত জায়গা অথবা মৌজেবালীর জায়গা- কোনোটিই সুনির্দিষ্ট করে অধিদপ্তর বা সচিবালয়ে প্রস্তাবনা আকারে পাঠানো হয়নি। প্রস্তাবনা না গেলে জায়গা বরাদ্দ হবে কীভাবে?”
নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী বলেন, “আমাদের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্বাস্থ্য। চরম সিদ্ধান্তহীনতার কারণে আজ পর্যন্ত আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাস পাইনি। একবার মেডিকেল কলেজটি এখান থেকে কেটে নেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যা আন্দোলনের মুখে বাতিল হয়। তবে নির্ধারিত স্থানে স্থায়ী ক্যাম্পাস না হওয়া পর্যন্ত আমরা আশঙ্কার মধ্যেই আছি।”
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান স্থাপনা নির্মাণ করে কলেজের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড শুরু করার জোর দাবি জানান।
ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা (রাজস্ব) প্রশাসক সুখময় সরকার জানান, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ একর জমি নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজকে দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে কাগজে-কলমে আন্তঃমন্ত্রণালয় রেজুলেশন রয়েছে।”
তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে দুইবার ওই জমি মেপে সীমানা চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে নতুন কোনো চিঠি বা নির্দেশনা জেলা প্রশাসন পায়নি। ফলে সীমানা নির্ধারণের পর আর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা এলে প্রশাসন সার্বিকভাবে তা দ্রুত বাস্তবায়নে প্রস্তুত রয়েছে।”
পড়ুন : নোয়াখালীতে ৫৮ বোতল বিদেশি মদসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার


