আন্তর্জাতিক আঙিনায় বাংলাদেশের থিয়েটার ও চলচ্চিত্রকে এক নতুন এবং আধুনিক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হৃদি হক। একের পর এক বৈশ্বিক মঞ্চে তাঁর শক্তিশালী পদচারণা প্রমাণ করছে সমসাময়িক থিয়েটার ও সিনেমা নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা কতটা বৈশ্বিক ও দূরদর্শী।
গত ২৭ জুন টেক্সাসের সিডার পার্কে আমেরিকার দর্শকেরা সাক্ষী হলেন তাঁর এক অনন্য সৃষ্টিশীল প্রয়াসের। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও দর্শনকে কেন্দ্র করে হৃদি হকের নিপুণ গ্রন্থনা ও প্রদীপ্ত উপস্থাপনায় মঞ্চস্থ হলো বিশেষ লাইভ মিউজিয়্যাল শো “চেতনাতে নজরুল”।

প্রথাগত ঘরানার বাইরে গিয়ে সংগীত, নাট্যভাষ্য ও কথনের এক অনবদ্য ফিউশনে পুরো আয়োজনটি অনন্য এক রূপ নিয়েছিল । মঞ্চে সরাসরি সংগীত পরিবেশন করেন নজরুলের গান ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এ তালিমপ্রাপ্ত শিল্পী কামরুজ্জামান রনি ও সুমনা ব্যানার্জী। নাট্য পরিচালক, থিয়েটার এর অন্যতম মুখ কামরুজ্জামান রনির সাথে আরও কিছু নজরুলের গানে যুগল পরিবেশনা করে আফরোজ মিদৌরি । তাঁদের সাথে লাইভ মিউজিয়্যাল টিমের তবলা, ভায়োলিন, গিটার অর্কেস্ট্রেশন ও সমন্বিত বাদ্যযন্ত্রের পাওয়ারফুল উপস্থিতি পুরো মিলনায়তনে এক দারুণ সাউন্ডস্কেপ তৈরি করে। প্রতিটি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নজরুলের বিদ্রোহ, প্রেম ও মানবিক চেতনা দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে একেবারে নতুন আঙ্গিকে। বাংলাদেশ ও ভারতসহ দুই বাংলার দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে সিডার পার্কের এই আয়োজনটি পরিণত হয়েছিল এক প্রাণবন্ত ও জমকালো মিলনমেলায়।

মঞ্চের এই সাফল্যের রেশ ধরে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনেও এখন দারুণ আলোচনায় হৃদি হকের নাম। তাঁর পরিচালিত প্রশংসিত চলচ্চিত্র “১৯৭১ সেইসব দিন” যুক্তরাষ্ট্রের সম্মানজনক ‘নিউ ইয়র্ক বাংলা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে। উৎসবের মূল প্রতিযোগিতায় একাধিক প্রধান বিভাগে মনোনয়ন পেয়ে ছবিটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে । ছবিটির ঝুলিতে এসেছে সেরা চলচ্চিত্র ও সেরা পরিচালকের মতো সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনোনয়ন, যার ভাগীদার খোদ হৃদি হক। পাশাপাশি সেরা গল্পকার হিসেবে প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ড. ইনামুল হক, সেরা সম্পাদক ও সেরা গায়ক—উভয় বিভাগেই কামরুজ্জামান রনি এবং প্রধান চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা ও অভিনেত্রী হিসেবে যথাক্রমে সজল নূর ও সানজিদা প্রীতি মনোনীত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলা সিনেমার এই গৌরবময় অর্জন আগামী ২ আগস্ট উৎসবের মূল গালা ইভেন্টে চূড়ান্ত ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। এছাড়া কানাডার টরেন্টো এবং আমেরিকার ফ্লুগারভিল এ প্রদর্শন এর পর আন্তর্জাতিক দর্শক এর বিপুল সাড়া চোখে পড়ার মতো!

হৃদি হকের এই মেধার স্পার্ক শুধু চলচ্চিত্র বা নির্দেশনায় নয়, তাঁর অভিনয়েও সমানভাবে দীপ্ত। নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ নাট্যোৎসব ‘সাউথ এশিয়ান থিয়েটার ফেস্টিভ্যাল’-এ “Flowers of Errors” নাটকে ব্যঙ্গরসের সূক্ষ্ম বুননে নির্মিত তাঁর অভিনয় দর্শকদের একদিকে যেমন প্রাণখুলে হাসিয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সমাজবাস্তবতার গভীর তাৎপর্য নিয়েও ভাবতে বাধ্য করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী সব নাট্যদলের মাঝে তাঁর এই পারফরম্যান্স থিয়েটার সার্কিটে বিশেষভাবে প্রশংসিত ও আলোচিত হয়।

এই দুর্দান্ত অভিজ্ঞতার পর, হৃদি হক এখন সম্পূর্ণ নতুন রূপে ব্যস্ত আছেন টেক্সাসের অস্টিনে তাঁর নতুন মঞ্চপ্রযোজনা নিয়ে। লেডি গ্রেগরির বিখ্যাত পলিটিক্যাল ড্রামা “The Rising of the Moon”-এর নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি। বিশ্বমানের ধ্রুপদী নাট্যের সাথে সমসাময়িক দৃষ্টিভঙ্গির এই ফিউশন আন্তর্জাতিক থিয়েটার কালচারে দারুণ প্রাসঙ্গিক ভূমিকা রাখবে বলে সবাই আশাবাদী।
পড়ুন: পর্তুগালকে কাঁদিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন
আর/


