বিজ্ঞাপন

অচল দুই পা ও এক হাত নিয়ে ৪০ বছর স্কুলের বারান্দাতেই মাহতাব

দুই পা প্রায় অচল, একটি হাতও ঠিকমতো কাজ করে না। নেই নিজের কোনো ঘর, নেই মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়। তবুও জীবনের কাছে হার মানেননি মাহতাব হোসেন। কারও কাছে হাত পাতেননি, ভিক্ষাকে বেছে নেননি। বরং একটি মাত্র সচল হাতকে পুঁজি করে টানা চার দশক ধরে লড়ে যাচ্ছেন জীবনের সঙ্গে।

বিজ্ঞাপন

সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের বড় ভাটড়া শেখপাড়া গ্রামের এই মানুষটির ঠিকানা এখন ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দা। ছোট্ট একটি চকি, কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস আর অদম্য আত্মসম্মান এই নিয়েই কেটে গেছে তার জীবনের ৪০ বছর।

বুধবার (৮ জুলাই) সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে যখন শিক্ষার্থীরা পাঠ নিচ্ছে, ঠিক তখনই বারান্দার এক কোণে নীরবে শুয়ে আছেন মাহতাব। শরীরের অসহায়ত্বকে ছাপিয়ে চোখে মুখে স্পষ্ট জীবনের প্রতি অবিচল লড়াইয়ের দৃঢ়তা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় মাহতাবের নিজের বাড়ি-ঘর, জমিজমা সবই ছিল। কিন্তু শৈশবে টাইফয়েডে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে তিনি শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, সেই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা তার সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখে নিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। আশ্রয়হীন মাহতাব তখন ঠাঁই নেন বিদ্যালয়ের বারান্দায়। সেই অস্থায়ী আশ্রয়ই আজ তার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা।

নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মাহতাব হোসেন বলেন, ছোটবেলায় আমিও সবার মতো সুস্থ ছিলাম। ১৩ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে শরীর অচল হয়ে যায়। যখন পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়লাম, তখন পরিবারের লোকজনই আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়।

তিনি জানান, প্রথম দিকে আশপাশের মানুষ খাবার দিলেও একসময় সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তখন বেঁচে থাকার তাগিদেই কাজ শেখেন। আমি হাতপাখার হাতল, চেয়ারের হাতল আর বেল্ট তৈরি করি। এতে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনো ভাবে জীবন চলে। অনেকেই ভিক্ষা করতে বলেছে, কিন্তু আমি কখনো ভিক্ষা করিনি। যতদিন বাঁচব, কারও কাছে হাত পাতব না।

কথার একপর্যায়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহতাব বলেন, আমার শুধু একটা ছোট্ট ঘর দরকার। ঝড়-বৃষ্টি হলে স্কুলের বারান্দায় খুব কষ্ট হয়। ঝড় উঠলেই মনে হয় আজই হয়তো শেষ দিন। যদি থাকার মতো একটি ঘর পেতাম, তাহলে জীবনের শেষ সময়টা একটু শান্তিতে কাটাতে পারতাম।

প্রায় ১৩ বছর ধরে মাহতাবের দেখাশোনা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা হাসিনা বেগম। গভীর মানবিকতার ছোঁয়া হাসিনা বেগম বলেন, মাহতাব ভাইকে এই অবস্থায় দেখে খুব কষ্ট লাগে। তাকে দেখার মতো কেউ নেই। তাই স্বামীর সঙ্গে কথা বলে ১৩ বছর ধরে যতটুকু পারি তার পাশে আছি। সময় পেলেই খাইয়ে দিই, গোসল করাই, কাপড় ধুয়ে দিই।

মানুষের নানা মন্তব্যের কথা তুলে তিনি বলেন, অনেকে জিজ্ঞেস করে, এসব করতে আমার ঘৃণা লাগে না? আমি বলি, যদি মাহতাবের জায়গায় আমার নিজের সন্তান থাকত, তাহলে কি তাকে ফেলে দিতে পারতাম? যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন মাহতাবের সেবা করে যাব।

ভাটড়া শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাকিবুল ইসলাম বলেন, মাহতাব ছোটবেলায় সুস্থ ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার পর পরিবার কিছুদিন চিকিৎসা করালেও পরে তাকে পরিত্যাগ করে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্কুলের বারান্দায় আছেন। শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন মাঝে মধ্যে তাকে সহযোগিতা করে। সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটি ঘরের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে অন্তত জীবনের শেষ সময়ে তিনি নিজের একটি ঠিকানা পাবেন।

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানান, মাহতাব হোসেনের বিষয়টি জানার পর প্রায় এক মাস আগে আমি সরেজমিনে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। তাকে দুই বান টিন দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

মাহতাব হোসেন শুধু একজন অসহায় মানুষের নাম নন, তিনি আত্মসম্মান, সংগ্রাম আর হার না মানা জীবনের এক জীবন্ত প্রতীক। দুই পা ও একটি হাত অচল হয়েও তিনি কখনো ভিক্ষার পথ বেছে নেননি, বেছে নিয়েছেন পরিশ্রমের সম্মান। অথচ যে মানুষটি ৪০ বছর ধরে একটি স্কুলের বারান্দাকে আশ্রয় বানিয়ে বেঁচে আছেন, তার শেষ ইচ্ছা মাত্র একটি মাথা গোঁজার ছোট্ট একটি ঘর। এখন প্রশ্ন একটাই সমাজ, বিত্তবান মানুষ আর রাষ্ট্র কি মাহতাবের সেই শেষ স্বপ্নটুকু পূরণ করবে, নাকি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বারান্দাই হয়ে থাকবে তার একমাত্র ঠিকানা?

পড়ুন : বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ: তৃতীয় স্থানে ঢাকা

সা/

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন