পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, প্রাণবৈচিত্র্য ও নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থা সুরক্ষায় বাংলাদেশে ব্যবহৃত অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক (Highly Hazardous Pesticides-HHPs) পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনগুলো।
সোমবার সকাল ১০টায় রাজশাহীর সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরাম ও গ্রীন কোয়ালিশনের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এ দাবি জানানো হয়। এতে কৃষক-কৃষানি, পরিবেশকর্মী, যুব প্রতিনিধি, গবেষক, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
গ্রীন কোয়ালিশন পবা উপজেলার সভাপতি রহিমা বেগমের সভাপতিত্বে এবং বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির নামে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত বিভিন্ন রাসায়নিক কীটনাশক শুধু ক্ষতিকর পোকামাকড় নয়, মানুষ, মৌমাছি, মাছ, পাখি, মাটি, পানি ও সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) যেসব কীটনাশককে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলো ক্যান্সার, হরমোনজনিত সমস্যা, প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি এবং পরিবেশ দূষণের মতো গুরুতর সংকট তৈরি করছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, PAN Asia Pacific-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ চারটি এশীয় দেশে ব্যবহৃত ৯৬ ধরনের কীটনাশকের মধ্যে ৫৩টিই অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব রাসায়নিকের প্রভাব শুধু কৃষকের ক্ষেতেই সীমাবদ্ধ নয়; খাদ্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ, পানিদূষণ, মাটির উর্বরতা হ্রাস, পরাগায়নকারী প্রাণীর মৃত্যু এবং জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির মাধ্যমে তা পুরো সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।
মানববন্ধনে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প কৃষি পদ্ধতি সম্প্রসারণে অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে বাধ্য।
নওহাটা মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সামা বলেন, “আগে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা জাতের দেশি মাছ উঠত। এখন জমির বিষাক্ত পানি এসে মাছের পোনা মরে যাচ্ছে, মাছও কমে গেছে। মাছ না থাকায় আমাদের আয়ও কমে গেছে এবং অন্য পেশা বেছে নিতে হচ্ছে। তাই এই বিষাক্ত কীটনাশক বন্ধ করতে হবে।”
আদিবাসী যুব পরিষদের সভাপতি উপেন রবিদাস বলেন, “অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহারে বুনো শাক, ভেষজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ, শামুক, কাঁকড়া ও অন্যান্য প্রাকৃতিক খাদ্য দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এতে খাদ্য বৈচিত্র্য, পুষ্টি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ করে এগ্রোইকোলজিভিত্তিক কৃষিকে জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান বলেন, “ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কীটনাশক ও রাসায়নিক নির্ভর কৃষি কখনোই টেকসই হতে পারে না।”
বারসিকের গবেষক শহিদুল ইসলাম বলেন, “WHO ও FAO যেসব কীটনাশককে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, সেগুলোর সঙ্গে ক্যান্সার, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি, হরমোনজনিত সমস্যা এবং প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংসের বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসব কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি।”
তিনি আরও বলেন, “অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধ করা মানে কৃষিকে দুর্বল করা নয়; বরং কৃষিকে আরও টেকসই, লাভজনক ও পরিবেশসম্মত করে তোলা।”
গ্রীন কোয়ালিশন পবা উপজেলার সাধারণ সম্পাদক কৃষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “কৃষকরা নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করতে চান। কিন্তু সহজলভ্য বিকল্প প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজার সহায়তার অভাবে অনেক সময় রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভর করতে হয়।”
এগ্রোইকোলজি লার্নিং সেন্টারের পরিচালনাকারী ও এগ্রোইকোলজি চর্চাকারী কৃষাণি সুলতানা খাতুন বলেন, “এগ্রোইকোলজি শুধু একটি কৃষি পদ্ধতি নয়, এটি প্রকৃতি, কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে ন্যায্য সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি দর্শন।”
মানববন্ধন থেকে গ্রীন কোয়ালিশন পবা উপজেলার সভাপতি রহিমা বেগম ১৫ দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশে ব্যবহৃত সব কীটনাশকের বৈজ্ঞানিক পুনর্মূল্যায়ন, WHO-FAO মানদণ্ড অনুযায়ী অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক পর্যায়ক্রমে নিষিদ্ধকরণ, খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার কার্যক্রম জোরদার, এগ্রোইকোলজি সম্প্রসারণ, কৃষকদের নিরাপদ বিকল্প প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ ও ভর্তুকি প্রদান এবং জাতীয় এগ্রোইকোলজি রূপান্তর কর্মসূচি গ্রহণ।
বক্তারা বলেন, অতিঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক নিষিদ্ধের দাবি শুধু কোনো একটি সংগঠনের দাবি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, কৃষকের অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার দাবি।


