চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মুনির উদ্দিনের পরিবারের পাঁচ সদস্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন ভাতার তালিকায় রয়েছেন। এর মধ্যে তাঁর বোনের নামে বিধবা ভাতা এবং ছেলে ও ভাতিজার নামে প্রতিবন্ধী ভাতা রয়েছে। এসব ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইউপি সদস্যের আপন বোন সাবরিনা আক্তার পিংকির নামে বিধবা ভাতা কর্মসূচির এমআইএস তালিকায় নাম রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি বিধবা নন। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১৩ জানুয়ারি রায়পুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু লোকমানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
তবে এ বিষয়ে ইউপি সদস্য মো. মুনির উদ্দিনের বক্তব্য ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, তাঁর বোনের ডিভোর্স হয়েছে। তৎকালীন এসিল্যান্ড ও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করেই তাঁকে বিধবা ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
সাবরিনা আক্তার পিংকি চট্টগ্রাম সদর রেজিস্ট্রি অফিসে নকলনবিশ হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। তাঁর সাবেক/বর্তমান বৈবাহিক অবস্থা এবং ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
এদিকে ইউপি সদস্যের ছেলে মোহাম্মদ আবরার বিন মুনিরের নামও প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচির এমআইএস তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, আবরার প্রতিবন্ধী নন এবং তিনি একই ইউনিয়নের একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করছেন।
ইউপি সদস্যের বড় ভাই মো. আলম উদ্দিনের ছেলে হাসান বিন আলম সাজিদের নামও প্রতিবন্ধী ভাতা কর্মসূচির তালিকায় রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাসানও প্রতিবন্ধী নন। তিনি রায়পুর এজাহারুল উলুম দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী এবং ২০২৭ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ইউপি সদস্যের বাবা মো. শামসুল আলমের নামেও প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড রয়েছে। তাঁর মা তাহেরা বেগমের নামে রয়েছে বয়স্ক ভাতার এমআইএস নম্বর। সব মিলিয়ে ইউপি সদস্যের পরিবারের পাঁচ সদস্য সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভিন্ন সুবিধার আওতায় রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, তাঁর বোন সেলিনা আক্তার (১৯) জন্মগত বাকপ্রতিবন্ধী। প্রায় পাঁচ বছর আগে সমাজসেবা অফিস থেকে তিনি সুবর্ণ কার্ড পেয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ইউপি সদস্যের মাধ্যমে তাঁকে প্রতিবন্ধী ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তিনি বলেন, পরে প্রায় এক বছর আগে তাঁরা সরাসরি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। এরপর তাঁর বোনের নাম ভাতাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
সেলিম উদ্দিনের অভিযোগ, ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ভাতার তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। প্রকৃত উপকারভোগীদের বাদ দিয়ে ইউপি সদস্যের আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে আরও অনিয়ম বেরিয়ে আসতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে ইউপি সদস্য মো. মুনির উদ্দিন বলেন, ‘আমার বোনের ডিভোর্স হয়েছে। তৎকালীন এসিল্যান্ড ও রায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের সঙ্গে পরিষদে আলোচনা করেই তাকে বিধবা ভাতার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।’
তাঁর ছেলে ও ভাতিজা প্রতিবন্ধী না হয়েও কীভাবে প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের প্রতিবন্ধী কার্ড আছে। সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও যাচাই-বাছাই করেই তাদের ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে হলে সমাজসেবা অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করেন।’
স্বজনপ্রীতি করে একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে বিভিন্ন ভাতার আওতায় আনার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি সদস্য বলেন, ‘এতে কোনো সমস্যা থাকলে তারা ভাতার আওতায় আসতে পারে।’
উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী উপকারভোগী নির্বাচন ও যাচাই-বাছাই করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ভাতা পাওয়ার ভিত্তি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. রিজোয়ান উদ্দীন বলেন, ‘কেউ আগে ডিভোর্স হলেও পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিয়ে করলে বিধবা ভাতা পাওয়ার সুযোগ থাকে না। এ ক্ষেত্রে বিধবা ভাতা বাতিল হয়ে যায়। তার ছেলে ও ভাতিজার প্রতিবন্ধী ভাতার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহোদয়কে অবহিত করা হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি আমি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দেখব। অভিযোগের সত্যতা ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, রায়পুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ভাতাভোগীদের তালিকা পুনঃযাচাই করা হোক। একই সঙ্গে প্রত্যেক ভাতাভোগীর যোগ্যতা, প্রতিবন্ধী সনদ, বৈবাহিক অবস্থা এবং ভাতা অনুমোদনের প্রক্রিয়া যাচাই করে অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
পড়ুন : নোয়াখালীতে দপ্তরির বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের জমি দখল করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ


