যে নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব নয় বলেছিলেন চিকিৎসকরা, সেই শিশুই সুস্থ হয়ে ফিরল মায়ের কোলে
মাত্র সাড়ে ৬শ গ্রাম ওজন নিয়ে জন্ম। চিকিৎসকদের ভাষায়, বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। তবে সব আশঙ্কাকে পেছনে ফেলে চাঁদপুর স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রায় দুই মাসের নিবিড় চিকিৎসা,হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অক্লান্ত চেষ্টা ও পরিবারের অদম্য প্রত্যাশা এবং সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে সুস্থ হয়ে মায়ের কোলে ফিরেছে সেই নবজাতক। বর্তমানে শিশুটির ওজন বেড়ে হয়েছে ১ কেজি ১৫০ গ্রাম।
জানা যায়, জাকির ও তানজিনা দম্পতির জমজ দুই সন্তানের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু গর্ভাবস্থার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় মায়ের জটিলতা দেখা দিলে ঢাকার একটি হাসপাতালে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় যমজ দুই সন্তান। জন্মের সময় প্রত্যেকের ওজন ছিল মাত্র সাড়ে ৬০০ গ্রাম।
অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া দুই নবজাতকের একজন জন্মের পরপরই মারা যায়। অপর শিশুটিকেও বাঁচানো সম্ভব নয় বলে চিকিৎসকেরা পরিবারকে জানায়ে দেয় এবং বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেন,তারা ভেঙে পড়েন। এই দম্পতি হাল না ছেড়ে তবুও শেষ চেষ্টা হিসেবে গত ১৯ জুন শিশুটিকে চাঁদপুর স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আজিজ মিয়া এবং ডা. রোমান মিজির তত্ত্বাবধানে শুরু হয় শিশুটির নিবিড় চিকিৎসা। এনআইসিইউতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি তার জন্য বিশেষ পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়। প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে অন্য মায়ের বুকের দুধও সংগ্রহ করা হয়।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. আজিজ মিয়া বলেন, চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টা, হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের নিবিড় পরিচর্যা এবং পরিবারের ধৈর্যের ফলে
মহান সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় ধীরে ধীরে শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। প্রায় দুই মাসের চিকিৎসা শেষে গত ১৪ আগস্ট তাকে আইসিইউ থেকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তার ওজন দাঁড়িয়েছে ১ কেজি ১৫০ গ্রাম।
তিনি বলেন, চিকিৎসকদের ভাষায়, মাত্র সাড়ে ৬০০ গ্রাম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া কোনো নবজাতকের এভাবে সুস্থ হয়ে ওঠা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তারা মনে করেন, আধুনিক চিকিৎসা, নিবিড় পরিচর্যা এবং মহান আল্লাহর রহমতেই শিশুটি নতুন জীবন পেয়েছে।
একদিকে এক সন্তান হারানোর গভীর বেদনা, অন্যদিকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আরেক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরার আনন্দ, এই দুই অনুভূতি নিয়েই দিন কাটছে জাকির-তানজিনা দম্পতির। তাদের আশা, বাকি পথটুকুও সুস্থভাবেই অতিক্রম করবে তাদের সন্তান।
চাঁদপুর স্পেশালাইজড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইয়ুম খান বলেন, আমাদের হসপিটালের এনআইসিওতে এ পর্যন্ত ১০০০ এরও বেশি শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এই শিশুটি ছিল সবচাইতে সংকটাপন্ন। ডাক্তার, নার্সসহ সকলের সমন্বয়ে শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি, আল্লাহর রহমতে শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে।
এদিকে হাসপাতালের আরেক পরিচালক সোহাগ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা ও আধুনিক নবজাতক চিকিৎসা সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হলে এ ধরনের সংকটাপন্ন শিশুর চিকিৎসা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব।
প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক এসোসিয়েশনের চাঁদপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক জিএম শাহীন বলেন, চাঁদপুরে মানসম্মত চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। শুধু আমাদের উপর আস্থা রাখতে হবে। এমন সংকটাপন্ন একটা শিশুর সুস্থ হয়ে উঠতে চিকিৎসক সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিরলস প্রচেষ্টা করতে হয়েছে।
আমরা ৭৫ পার্সেন্ট চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকি। শুধু ব্যবসায়ি হিসেবে আমাদেরকে গণ্য করলে হবে না, আমরা প্রাইভেট হসপিটাল গুলো রোগীর সেবা দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে সরকারি সহযোগিতা, যথাযথ প্রণোদনা ও সকলের আন্তরিকতায় আমরা এগিয়ে যেতে চাই।
মৃত্যুর শঙ্কা নিয়েই পৃথিবীতে এসেছিল সাড়ে ৬শ গ্রাম ওজনের সেই শিশুটি। আজ প্রায় দুই মাসের লড়াই শেষে সে মায়ের কোলে। চিকিৎসক, পরিবার এবং হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি শুধু একটি সফল চিকিৎসার গল্প নয়, বরং নতুন জীবনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
পড়ুন:মেহেরপুরে জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন
ইমি/


