বিজ্ঞাপন

৯২ বছর রাজশাহীবাসীর তৃষ্ণা মিটিয়ে ঢোপকলগুলো এখন শুধু স্মৃতি

দীর্ঘ প্রায় ৯২ বছর ধরে রাজশাহীবাসীর তৃষ্ণা মিটিয়ে ঢোপকলগুলো এখন শুধু স্মৃতি। কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল গুলো এখন শুধু স্মৃতী। এই ঢোপকলগুলো সাক্ষ্য বহন করছে যে কীভাবে নগর প্রশাসনের উদ্যোগ। রাজশাহীতে পুরো শহরজুড়ে একসময় শতাধিক (প্রায় ১০০ থেকে ১১২টির মতো) ঢোপকল স্থাপন করা হয়েছিল। বর্তমানে এর অধিকাংশই বিলুপ্ত হলেও প্রায় ৩৫টির মতো ঢোপকল স্মারক বা প্রতীকী রূপ হিসেবে টিকে রয়েছে।

১৯৩৭ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত টানা প্রায় তিন দশক এই ঢোপকলগুলো রাজশাহী শহরের খাবার পানির প্রধান উৎস ছিল। পরবর্তীতে আধুনিক পাইপলাইন ও ওয়াসার সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় ঢোপকলের উপযোগিতা কমে যায়। বর্তমানে এটি রাজশাহীর ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

বরেন্দ্রভূমি এলাকায় সুপেয় পানি সমস্যা ছিলো। রাজশাহীতে জলের প্রধান উৎস ছিলো মূলত নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে চলা পদ্মা নদী আর নগরীর ভেতরে থাকা পুকুর ও দিঘীগুলো। এছাড়াও অবস্থাসম্পন্ন বাড়িগুলোতে ছিলো ইঁদারা, কুয়া ও নলকূপ। তবে সাধারণ মানুষকে পানির জন্য মূলত নির্ভর করা লাগতো নদী ও পুকুরগুলোর ওপরই। বারোয়ারী ব্যবহারে পুকুরগুলোর পানি অনেক সময়ই দূষিত হয়ে পড়ত। ফলে প্রায় প্রতি বছরই নগরবাসীদের ভুগতে হতো ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরাসহ নানা পানিবাহিত রোগে। এসব রোগে প্রতিবছর অনেকের মৃত্যুও ঘটতো।

১৯৩০-এর দশকে রাজশাহী শহরে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং দূষিত পানি পানের কারণে কলেরা, আমাশয়সহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সেই সময় শত শত মানুষ প্রাণ হারাতেন।

১৯৩৪ সালে রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন রায় ডি. এন. দাশগুপ্ত। তিনি দায়িত্ব লাভের পর রাজশাহী বাসীর এই দুর্দশা লাঘবের পদক্ষেপ নিলেন। তার নেতৃত্বে পৌরসভা সিদ্ধান্ত নেয় রাজশাহীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্থাপন করা হবে সুপেয় পানি সরবরাহের কল। মিনিস্ট্রি অব ক্যালকাটার অধীনে পৌরসভার উদ্যোগ ও পরিচালনায় নগরীতে প্রথমবারের মতো স্থাপিত হবে ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ নামে পানি শোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা।

পৌরসভার এই উদ্যোগে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছিল জনকল্যাণমূলক সংগঠন রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন কেবল নিজেরাই এগিয়ে এলো না, তারা শহরের ধনী ব্যক্তিদের প্রতিও আহবান জানাল সহায়তার জন্য। সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এলেন তৎকালীন পুঠিয়ার মহারানী হেমন্তকুমারী। তিনি একাই দান করলেন ৬৫ হাজার টাকা।

নগরীর হেতম খাঁ এলাকায় রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে নির্মাণ করা হলো পানি শোধনাগার। এতে ব্যয় হয় ২ লক্ষ ৫৩ হাজার ২শত ৮৫ টাকা। মহারানী হেমন্তকুমারীর বিরাট অঙ্কের একক দানের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এর নাম ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ এর বদলে দেয়া হলো ‘মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট যাত্রা শুরু করলো মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস।

রাজশাহীর মোড়ে মোড়ে স্থাপিত হলো পানির কল। নগরবাসী এই ধরনের পানির কল আগে দেখেনি। তাদের কাছে এটি পরিচিত হয়ে উঠলো ‘মহারানীর ঢোপকল’ বা ‘হেমন্তকুমারীর ঢোপকল’ বা শুধু ‘ঢোপকল’ নামে। পরবর্তী দিনগুলোতে এই ঢোপকলগুলোই পরিণত হলো নগরীর বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎসে।

মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের অধীনে নগরীর মোড়ে মোড়ে নির্মিত হয় শতাধিক ঢোপকল। এগুলো একাধারে ছিলো রিজার্ভার এবং কল। প্রতিটি ঢোপকল এর উচ্চতা ভূমি থেকে ১২ ফুট এবং ব্যাস ৪ ফুট। প্রতিটি ঢোপকল ৪৭০ গ্যালন পানি ধারণ করতে পারতো। নিচের দিকে থাকতো একটি ট্যাপ যা দিয়ে পানি সংগ্রহ করা হতো। সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে একেকটি ঢোপকল তৈরি হতো। টিনের সাহায্যে ঢেউ খেলানো নকশা করা হতো এতে। অত্যন্ত মজবুত করে তৈরি করা হতো একেকটি ঢোপকল।

প্রতিটি ঢোপকল ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে যুক্ত ছিলো নগরীর হেতম খাঁ-তে অবস্থিত পানি শোধন কেন্দ্রের সাথে। পাইপগুলো ছিলো কাস্ট আয়রনের আর অন্যান্য ফিটিংসগুলো ছিলো পিতলের তৈরি। কেবলমাত্র সিমেন্টের ঢোপকল বাদ দিয়ে বাকি সব জিনিসপত্রই ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিলো।

হেতম খাঁয় অবস্থিত মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের দৈনিক ৭০০ ঘন মিটার ভূগর্ভস্থ পানি শোধন করার ক্ষমতা ছিল। এখানে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষরতা ও পানিতে থাকা আয়রন পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করে পাঠানো হত ঢোপকলগুলোতে। পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে পানি সরবরাহ করা হত। সেই পানি জমা থাকতো ঢোপকলগুলোতে। ফলে ঢোপকলগুলো থেকে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। প্রতিটি ঢোপকলে বালি ও পাথর এর স্তর দিয়ে তৈরি রাফিং ফিল্টার ছিলো। ফলে পরিশ্রুত পানি আরো পরিশ্রুত হয়ে বের হত। এছাড়া গরমের সময় ঠান্ডা পানিও পাওয়া যেত।

প্রতিটি ঢোপকল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হত। প্রতিটি ঢোপকলের ওপরে থাকতো ঢাকনা। এটি দিয়ে ভেতরে মানুষ প্রবেশ করতে পারতো। প্রতি দুই মাস অন্তর পৌরসভার কর্মীরা এর ভেতরে ঢুকে জীবানুনাশক ও অন্যান্য পরিষ্কারক দিয়ে ঢোপকলগুলো পরিপূর্নভাবে পরিষ্কার করা হতো। এছাড়াও প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর শহরের প্রতিটি ঢোপকল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হতো ল্যাবে। পানির গুণগত মান যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা হতো। সেই সময়ে রাজশাহী নগরবাসী পেয়েছিলো অসাধারণ এবং নিরাপদ এক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।

সময়ের সাথে সাথে রাজশাহীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাড়তে থাকে নগরীর আকার। একসময়ের পানির প্রধান উৎস ঢোপকলগুলো আর নগরবাসীর চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না। প্রয়োজন হয় নতুন প্রযুক্তির।

১৯৬১ সালে নতুন নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। সারা শহরে বেশ কয়েকটি বিরাটাকারের ওভার হেড পানির ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। নগরে গড়ে ওঠে সমান্তরাল আরেকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ১৯৬৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ঢোপকলগুলো যুক্ত হয় নতুন পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে। তখনও অবশ্য ঢোপকলগুলোর গুরুত্ব তেমন কমেনি। তবে সময়ের ব্যবধানে এগুলো এখন শুধু স্মৃতী।

বর্তমান সময়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজ রহমান রিটন বলেন, ঐতিহ্যবাহী ঢোপকল গুলোকে স্মৃতী হিসাবে সংরক্ষন করেছন। এগুলো পানি সরবরাহে কাজে ব্যবহার না হলেও ধ্বংস করা হয়নি। রসিক প্রশাসক ঢোপকল গুলো সংগ্রহ করে শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রতিস্থাপন করেছেন। ওই ঢোপগুলো নতুন করে সংস্কার করে শহরের চৌরাস্তাসহ চিহৃত স্থানে রাখা হয়েছে।

রাসিক প্রশাসক বলেন, এগুলো রাজশাহীর ঐতিহ্য। ঢোপগুলো সংরক্ষনে থাকলে পরবর্তী প্রজন্ম এবিষয়ে জানতে পারবে। দেশের অবকাঠামো ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারও ব্যবধান বুঝতে পারবে। সর্বপরি পূর্ব পুরুষদের শ্রদ্ধা দিয়ে বর্তমান তৃপ্তি।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : দোহারে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন