বিজ্ঞাপন

বড় সরদার বাড়িতে ‘কোক স্টুডিও’র শুটিং, ক্ষতির অভিযোগ: তদন্ত চায় সংরক্ষণ কমিটি

শত বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বড় সরদার বাড়ি। দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ থাকার পর কোটি টাকা ব্যয়ে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি। এবার সেই ভবনে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের কারণে ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বড় সরদার বাড়িতে ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর ভিডিও ধারণ এবং কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন তৈরির কাজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’। তাদের অভিযোগ, চার দিনের শুটিংয়ে ভারী ক্যামেরা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শনিবার (২৯ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে বড় সরদার বাড়ি রক্ষা, ক্ষয়ক্ষতির তদন্ত এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির স্বাধীন তদন্তসহ ১২ দফা দাবি জানায় সংগঠনটি।

শুটিংয়ের পর দেয়াল-অলংকরণে ক্ষতির অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ২০১২ সালে বড় সরদার বাড়ির পুনরুদ্ধার কাজ শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। পরের বছর দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় ভবনটি।

তবে সম্প্রতি বাণিজ্যিক শুটিংয়ের পর ভবনের দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়। দ্বিতীয় আঙিনার কাছেও একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় শুটিংয়ের আগে কোনো ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ করা হয়েছিল কি না, তা জানতে চেয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বা মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

সংগঠনটির দাবি, শুটিংয়ের অনুমোদন, এ বাবদ আর্থিক লেনদেন এবং শুটিংয়ের আগে ও পরে বড় সরদার বাড়ির অবস্থার নথি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।

‘ঐতিহাসিক স্থাপনা স্টুডিও বানানোর জায়গা নয়’

সংবাদ সম্মেলনে চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, সোনারগাঁ জাদুঘর ও বড় সরদার বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

তার অভিযোগ, ঐতিহাসিক স্থাপনাটি বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দিয়ে সেখানে স্টুডিও নির্মাণ, শুটিং এবং ভারী স্থাপনা বসানোর কারণে বড় সরদার বাড়ির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এসব কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকলে তার কারণ প্রকাশের দাবি জানান রফিউর রাব্বি।

কারুপল্লীর দোকান নিয়েও প্রশ্ন

শুধু বড় সরদার বাড়ির ক্ষয়ক্ষতি নয়, সোনারগাঁ জাদুঘরের কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ তুলেছে সংরক্ষণ কমিটি।

সংগঠনটির দাবি, প্রকৃত কারুশিল্পীদের তুলনামূলকভাবে পেছনের দিকে রাখা হলেও এক নম্বর গেট ও পার্কিং এলাকার পাশে অর্থের বিনিময়ে কিছু ব্যক্তিকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেই প্রকৃত কারুশিল্পী নন বলেও দাবি করা হয়।

দোকান বরাদ্দের নীতিমালা, বরাদ্দপ্রাপ্তদের পরিচয় এবং এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ করা হয়।

অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া প্রায় অর্ধকোটি টাকার অনুষ্ঠান আয়োজন, ভুয়া বিল ও চেকের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অনুমোদন ছাড়া তিন কোটি টাকার বেশি ব্যয়, নির্মাণ ও মেরামতকাজে অতিরিক্ত বিল এবং শ্রমিক ও কাঁচামালের নামে ভুয়া বিল তৈরি।

তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বক্তব্য জানা যায়নি।

‘বড় সরদার বাড়ির ক্ষতি হলে ইতিহাস ফিরবে না’

সংগঠনটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস বলেন, তাদের এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়। ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃত কারুশিল্পী এবং জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্যই তারা কথা বলছেন।

তিনি বলেন, বড় সরদার বাড়ির কোনো স্থায়ী ক্ষতি হলে তা নতুন করে নির্মাণ করেও শত শত বছরের ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। একইভাবে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত রেখে দেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করাও সম্ভব নয়।

১২ দফা দাবি

সংবাদ সম্মেলন থেকে বড় সরদার বাড়ি ও লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তে ১২ দফা দাবি জানানো হয়।

দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ফাউন্ডেশনের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত, বড় সরদার বাড়িতে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের নথি প্রকাশ, শুটিং বাবদ অর্থের নিরীক্ষা এবং স্বাধীন সংরক্ষণ স্থপতি ও প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ভবনটির জরুরি কারিগরি পরিদর্শন।

এ ছাড়া ঐতিহাসিক ভবনে বাণিজ্যিক শুটিং ও বিজ্ঞাপনের আগে ‘হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ বাধ্যতামূলক করা, নির্মাণ ও ক্রয়সংক্রান্ত ব্যয়ের বিশেষ নিরীক্ষা, কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দের নথি প্রকাশ এবং প্রকৃত কারুশিল্পীদের সুবিধাজনক স্থানে দোকান বরাদ্দের দাবি জানানো হয়।

তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারেরও দাবি জানায় সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলন থেকে সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ রক্ষায় গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী, প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, গবেষক, কারুশিল্পী ও সচেতন নাগরিকদের পাশে থাকার আহ্বান জানানো হয়।

পড়ুন:তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে: আমান উল্লাহ আমান

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন