বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের বাঁক ঘোরানো তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা ও ফ্যাশন আইকন ছিলেন সালমান শাহ। কিন্তু হঠাৎ করেই পরপারে পাড়ি জমান তিনি। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে এই নায়কের মৃত্যুর সময় কয়েকটি সিনেমার শুটিং চলছিল।
কোনও সিনেমার অর্ধেক কাজ বাকি, কোনও সিনেমার ক্লাইম্যাক্স অসমাপ্ত, কোথাও আবার গান ও ডাবিং শেষ হয়নি। কিন্তু থেমে যায়নি তার সিনেমাগুলোর কাজ।
অভিনেতার আকস্মিক মৃত্যুর পর নির্মাতাদের সামনে তখন বড় প্রশ্ন; অসমাপ্ত সিনেমাগুলোর কী হবে? কেউ গল্প বদলেছেন, কেউ ডামি ব্যবহার করেছেন। কেউ নতুন নায়ককে পর্দায় এনেছেন। আবার কয়েকটি সিনেমায় সালমান শাহর শুট করা অংশই বাদ দিয়ে অন্য অভিনেতাকে নিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে সিনেমা।
৩০ বছর পর ফিরে দেখা যাক, সালমান শাহর অসমাপ্ত সিনেমাগুলো শেষ করেছিলেন কারা এবং কীভাবে।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া অসমাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে ছিল ‘প্রেম পিয়াসী’। ১৯৯৭ সালের ১৮ এপ্রিল সিনেমাটি মুক্তি পায়। এই ছবিতে সালমান শাহ গান, ক্লাইম্যাক্সসহ বেশ কয়েকটি দৃশ্যের কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। ফলে সিনেমাটি শেষ করতে নির্মাতাদের নিতে হয় ভিন্ন কৌশল।
গানের দৃশ্যে নায়িকা শাবনূরকে সামনে রেখে শুটিং করা হয়। সালমানের উপস্থিতি দেখাতে কয়েকটি দৃশ্যে ব্যবহার করা হয় ডামি ও দূর থেকে নেওয়া শট। শেষ পর্যন্ত গল্পের শেষ অংশেও পরিবর্তন আনতে হয় নির্মাতাকে। সালমানের মৃত্যুর পর ‘প্রেম পিয়াসী’সহ কয়েকটি সিনেমা অন্য অভিনেতা ও ডামিশিল্পীদের সহায়তায় শেষ করার তথ্য বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
‘স্বপ্নের নায়ক’ শেষ করেন আমিন খান
সালমান শাহকে ছাড়া একটি সিনেমার গল্প কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়; তার সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ ‘স্বপ্নের নায়ক’। সিনেমাটির অর্ধেকের কম কাজ করেছিলেন সালমান শাহ। এরপর গল্প পরিবর্তন করে মাঝপথেই তাঁর চরিত্রের মৃত্যু দেখানো হয়।
তারপর সিনেমার গল্প এগিয়ে নিতে যুক্ত হন আমিন খান। অর্থাৎ, সালমান শাহর অসমাপ্ত চরিত্রের জায়গায় সরাসরি কাউকে বসানো হয়নি; বরং গল্পের মধ্যেই তার চরিত্রের সমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন চরিত্রকে সামনে আনা হয়। ১৯৯৭ সালের ৪ জুলাই মুক্তি পায় সিনেমাটি।
ডামির সাহায্যে শেষ ‘শুধু তুমি’
‘শুধু তুমি’র অবস্থা ছিল আরও জটিল। সালমান শাহ সিনেমাটির মাত্র ৩০ শতাংশের কম কাজ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার অনুপস্থিতিতে বাকি গল্প এগিয়ে নেওয়া ছিল কঠিন। শেষ পর্যন্ত ডামি ব্যবহার এবং গল্পে পরিবর্তন এনে সিনেমাটির কাজ শেষ করা হয়। তবে ডামির ব্যবহার দর্শকদের চোখ এড়ায়নি।
১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি তাই সালমান শাহর অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে নির্মাতাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।
‘আনন্দ অশ্রু’: শেষ করেন নির্মাতা শিবলি সাদিক
‘আনন্দ অশ্রু’র বেশির ভাগ শুটিং সালমান শাহর জীবদ্দশাতেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু বাকি ছিল শেষ দৃশ্য, কয়েকটি গানের শুটিং এবং ডাবিং। পরিচালক শিবলি সাদিকের সিনেমাটি পরে সম্পন্ন করা হয় সালমান শাহকে ছাড়াই।
১৯৯৭ সালের ১ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ‘আনন্দ অশ্রু’ সালমান শাহর মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর অন্যতম আলোচিত সিনেমা। তার অসমাপ্ত কাজের মধ্যে এটি তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি সম্পন্ন অবস্থায় ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সালমানের জায়গায় এলেন ফেরদৌস
সবচেয়ে অভিনব সমাধানটি আসে ‘বুকের ভিতর আগুন’ সিনেমায়। পরিচালক ও প্রযোজক ছটকু আহমেদের সিনেমাটির উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ বাকি ছিল সালমান শাহর মৃত্যুর সময়। শুধু ডামি ব্যবহার করে সিনেমাটি শেষ করা সম্ভব ছিল না। তখন গল্পেই আনা হয় বড় পরিবর্তন।
কাহিনিতে দেখানো হয়, প্লাস্টিক সার্জারির কারণে চরিত্রটির চেহারা বদলে গেছে। সেই পরিবর্তিত চরিত্রে পর্দায় আসেন ফেরদৌস আহমেদ।
এভাবেই সালমান শাহর অসমাপ্ত সিনেমা শেষ করতে যুক্ত হন নতুন একজন নায়ক। ‘বুকের ভিতর আগুন’ ছিল ফেরদৌসের বড় পর্দায় অভিষেকের সিনেমা এবং সালমান শাহ অভিনীত সর্বশেষ মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিও এটি। সিনেমাটির কাজ শেষ করতে গল্প পরিবর্তন করে ফেরদৌসকে যুক্ত করার কথা পরিচালক ছটকু আহমেদ নিজেও বলেছেন।
সালমানের দৃশ্য বাদ দিয়ে আসেন রিয়াজ
সব অসমাপ্ত সিনেমা ডামি বা গল্প পরিবর্তন করে শেষ করা হয়নি। ‘মন মানে না’র ক্ষেত্রে নেওয়া হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন সিদ্ধান্ত। সালমান শাহ সিনেমাটির কিছু অংশের কাজ করেছিলেন। পরে তাঁর মৃত্যুর পর সেই অংশ বাদ দিয়ে রিয়াজকে নিয়ে সিনেমাটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়।
অর্থাৎ, এখানে সালমান শাহর অসমাপ্ত চরিত্র শেষ করার চেষ্টা করা হয়নি। বরং সিনেমাটিই নতুন নায়ককে নিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন সূত্রে সালমান শাহর মৃত্যুর সময় সিনেমাটির উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
ওমর সানী ও অমিত হাসানের হাতে নতুন করে নির্মাণ
একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আরও কয়েকটি সিনেমার ক্ষেত্রে। সালমান শাহর কিছু অংশের শুটিং করা দৃশ্য বাদ দিয়ে ওমর সানীকে নিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয় ‘কে অপরাধী’। অন্যদিকে অমিত হাসানকে নিয়ে নতুনভাবে নির্মাণ করা হয় ‘তুমি শুধু তুমি’।
অর্থাৎ, এই সিনেমাগুলোতে সালমান শাহর অসমাপ্ত কাজকে জোড়া লাগানো হয়নি। তার শুট করা অংশ বাদ দিয়ে নতুন অভিনেতাকে নিয়ে শুরু হয়েছিল নতুন শুটিং। সালমান শাহর মৃত্যুর পর অসমাপ্ত কয়েকটি সিনেমা অন্য নায়কদের দিয়ে নতুন করে নির্মাণের তথ্য বিভিন্ন চলচ্চিত্রবিষয়ক সূত্রে পাওয়া যায়।
যে সিনেমাটি শেষই হয়নি
সব সিনেমার ভাগ্য অবশ্য এক ছিল না। ‘প্রেমের বাজি’ শেষ পর্যন্ত আর সম্পন্ন হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সালমান শাহর মৃত্যুর পর অন্য অভিনেতাকে নিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয়নি সিনেমাটি। ফলে তাঁর অসমাপ্ত সিনেমাগুলোর মধ্যে এটি রয়ে যায় অসমাপ্ত ইতিহাস হিসেবেই।
সবমিলিয়ে সালমান শাহর অসমাপ্ত সিনেমাগুলোর গল্পে তাই একাধিক মানুষের নাম জড়িয়ে আছে। কিন্তু ৩০ বছর পরও এসব সিনেমা দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে; সালমান শাহর জায়গা কেউ পূরণ করতে পারেননি। নির্মাতারা সিনেমা শেষ করেছিলেন, গল্প বদলেছিলেন, নতুন নায়ক এনেছিলেন, আবার কোথাও কোথাও ডামি ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু দর্শক পর্দায় বারবার খুঁজেছেন সেই মানুষটিকেই, যিনি সিনেমাগুলো শুরু করেছিলেন—কিন্তু শেষ দৃশ্য পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি।
পড়ুন:মৃত্যুর ৩০ বছর পরেও নায়ক সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহ ও কৌতুহল কেন?
ইমি/


