টাঙ্গাইলে তিনদিনব্যাপী ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ শেষ হল রোববার রাতে। শেষ দিনে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই ভিড় করছেন মিষ্টি প্রেমীরা। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পোড়াবাড়ির চমচম, মির্জাপুরের জামুর্কীর সন্দেশ, মধুপুরের গারোর বাজারের রসোগোল্লা, বাসাইলের সাদা দইসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া মিষ্টির দেখা মিলেছে এই মেলায়। প্রত্যেক উপজেলা থেকে স্টল অংশ নিয়েছে। ওই সব স্টলে নিজ নিজ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি প্রদর্শন ও বিক্রয় করা হয়। রোববার বিকেলে ও সন্ধ্যায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
এর আগে শুক্রবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পৌর উদ্যানে টাঙ্গাইলের পর্যটন সম্ভাবনাকে আরও বিকশিত করতে প্রথমবারের মতো তিনদিনব্যাপী ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ উদ্বোধন করেন মৎস ও প্রাণি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। একই সাথে দর্শনার্থীদের জন্য টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী শাড়িরও প্রদর্শন করা হয়।
রোববার সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়তে থাকে। তবে দুপুর এবং বিকেল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ে। বৃষ্টি উপেক্ষা করে অনেক মানুষ ভীড় করে মেলায়। ব্যতিক্রমী এই আয়োজনের ফলে মিষ্টি ও তাঁতশিল্পের সমন্বয়ে টাঙ্গাইলের নিজস্ব ঐতিহ্যকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। টাঙ্গাইলের জিআই পণ্য ও ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় শিল্পকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন জেলার পর্যটন খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে। পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, মিষ্টি কারিগর, তাঁতশিল্পী ও ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার ও ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকেই ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ এ ভিড় ছিলো। তবে দুপুরের পড় থেকে ভিড় বাড়তে থাকে। সন্ধ্যার পর পর পা ফেলানোর জায়গা নেই। ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ বিভিন্ন বয়সী মানুষের দেখা যায়। কেউ আসছেন পরিবার পরিজন নিয়ে, আবার কেউ আসছেন, বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে। তবে পুরুষের চেয়ে মহিলাদের বেশি দেখা যায়।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এ উৎসবের প্রধান লক্ষ্য তিনটি। প্রথমত, ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ গড়ে তুলে টাঙ্গাইলের শতবর্ষী মিষ্টি শিল্পকে বিশ্বব্যাপী পরিচিত করা। দ্বিতীয়ত, ঐতিহ্যকে ধারণ করে তরুণদের জন্য উদ্যোক্তা তৈরির একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। তৃতীয়ত, স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রত্যেকটি উপজেলা থেকে স্টল অংশ নিয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২২টি স্টল রয়েছে। প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশিই দর্শনার্থীদের সমাগম ছিলো।
কাগমারী থেকে আসা রায়হান মিয়া বলেন, মিষ্টির জন্য টাঙ্গাইলের অনেক সুনাম রয়েছে। জেলার বিভিন্ন প্রান্তে নানা রকমের মিষ্টি তৈরি হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে এসেছি। এসে খুব ভালো লেগেছে। সবার সাথে মিষ্টি খেয়েছি।
আরেক মিষ্টিপ্রেমী রিনা আক্তার বলেন, গতকাল ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ এসেছিলাম। আজকেও এসেছি। অনেকগুলো মিষ্টি খেয়েছি। খুব ভালো লেগেছে। আমি বাসার জন্য মিষ্টি নিতে নিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়িও দেখেছি।
বিভিন্ন উপজেলা থেকে আগত বিক্রেতারা বলেন, তিনদিনে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। বিক্রিও বেশ ভালো হয়েছে। টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যকে তুলে ধরাই আমাদের মূল লক্ষ। প্রতি বছরই এমন আয়োজনের দাবি করছি।
জেলা মিষ্টি মালিক সমিতির সভাপতি স্বপন ঘোষ বলেন, এ আয়োজনের মাধ্যমে টাঙ্গাইল পোড়াবাড়ির চমচম ঐতিহ্য তুলে ধরতে পেরেছি। মেলায় প্রচুর লোকজনের সমাগম ঘটেছে। মিষ্টির প্রতি মানুষের আগ্রহ রয়েছে। এই প্রথম বারের মতো আয়োজন সফল হয়েছে।
এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক বলেন, টাঙ্গাইল জেলার শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি শিল্পকে প্রথমবারের মতো একটি বর্ণিল উৎসবের রূপ দিতে পেরে আমি গভীরভাবে আনন্দিত। এই উৎসব শুধুমাত্র পোড়াবাড়ির বিখ্যাত চমচমকেই নয়, বরং টাঙ্গাইল জেলার প্রতিটি উপজেলার দক্ষ কারিগরদের সযত্নে তৈরি স্বতন্ত্র ও ঐতিহ্যবাহী সব মিষ্টিকে জাতীয় পরিমণ্ডলে নতুন করে পরিচিত করেছে। সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও ভালোবাসাই এই উৎসবকে প্রাণবন্ত করেছে।
তিনি আরো বলেন, আমার প্রত্যাশা, আগামীতে এই উৎসব প্রতি বছর আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত হবে এবং দূর-দূরান্ত থেকে টাঙ্গাইলে ছুটে আসবে মিষ্টিপ্রেমী মানুষ। ইতিহাস-ঐতিহ্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মিষ্টি শিল্পের রাজধানী হিসেবেও টাঙ্গাইল হয়ে উঠুক পর্যটনের নতুন গন্তব্য।
পড়ুন : সরাইলে রায়হান হত্যা মামলার আসামির কারাগারে মৃত্যু


