রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ৩০০ ফিট। দিনে ব্যস্ত এই সড়ক রাত নামলেই অনেক জায়গায় হয়ে ওঠে নির্জন। আর সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে উঠছে ছিনতাইকারী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র। কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে, কখনো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, আবার কখনো যাত্রী বা মোটরসাইকেল আরোহীদের পথরোধ করে সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে। সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনায় ৩০০ ফিট সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কেন এই সড়কে বারবার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে?
সর্বশেষ গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে খিলক্ষেত থানার আওতাধীন ৩০০ ফিট মহাসড়কে ঘটে চাঞ্চল্যকর একটি ঘটনা। স্বদেশ প্রোপার্টিজের সামনে দুই নম্বর সেতুর নিচে মোটরসাইকেল নিয়ে অবস্থান করা কয়েকজন তরুণের পথরোধ করে একটি প্রাইভেটকার। গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজন নিজেদের র্যাব সদস্য পরিচয় দেন। কাগজপত্র দেখতে চাওয়ার পর পরিস্থিতি সন্দেহজনক মনে হলে ভুক্তভোগীরা তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর তাঁদের মারধর করে জোরপূর্বক গাড়িতে তোলার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর টাকা, মুঠোফোন ও মোটরসাইকেল কেড়ে নেওয়া হয়। পরে পিংক সিটির সামনে তাঁদের নামিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি এখানেই শেষ হয়নি। ভুক্তভোগীদের একজন কৌশলে অভিযুক্তদের গাড়ির চাবি নিয়ে দৌড়ে গিয়ে স্বদেশ চত্বরে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানান। পরে খিলক্ষেত থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি প্রাইভেটকারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাঁচটি ডামি পিস্তল, চারটি ডামি ম্যাগাজিন, পিস্তলের কাভার, ইলেকট্রিক শক মেশিন, ছুরি ও স্টিলের বাটনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। ছিনতাই হওয়া একটি মোটরসাইকেল ও মুঠোফোনও উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজন নিজেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
সাম্প্রতিক এই ঘটনা ৩০০ ফিট সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করলেও এ ধরনের ঘটনা এ পথের জন্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে ৩০০ ফিট সড়কে প্রাইভেটকারে যাত্রী তুলে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই ঘটনায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তাকে গাড়িতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ছিল।
এরও আগে ২০২৫ সালের মার্চে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে রডবোঝাই একটি লরি ছিনতাই করে ৩০০ ফিট সড়ক দিয়ে পালানোর সময় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে খিলক্ষেত থানা-পুলিশ। পুলিশ ধাওয়া করে মাস্তুল ফুটওভার ব্রিজসংলগ্ন এলাকা থেকে লরিটি উদ্ধার করে। লরিতে থাকা রডের মূল্য ছিল প্রায় ৩৭ লাখ টাকা।
ঘটনাগুলোর ধরন আলাদা হলেও একটি বিষয়ে মিল রয়েছে—৩০০ ফিটের বিস্তীর্ণ ও তুলনামূলক নির্জন অংশকে অপরাধীরা তাদের সুবিধাজনক এলাকা হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীদের ভাষ্য, রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়কের অনেক অংশে মানুষের চলাচল কমে যায়। কোথাও ফাঁকা জায়গা, কোথাও নির্মাণাধীন এলাকা, আবার কোথাও দীর্ঘ দূরত্ব পর্যন্ত দোকানপাট বা বসতি নেই। ফলে কোনো যানবাহন থামিয়ে যাত্রী বা পথচারীকে ভয় দেখানো কিংবা জোর করে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিকভাবে আশপাশের মানুষের নজরে আসার সম্ভাবনা কম।
তবে শুধু নির্জনতা দিয়ে এসব ঘটনার ব্যাখ্যা করা যায় না। একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—অপরাধীরা কীভাবে এতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে? তারা কি আগে থেকেই নির্দিষ্ট স্থান ও সময় বেছে নেয়? সড়কের কোথায় পুলিশি নজরদারি কম, কোথায় দ্রুত পালিয়ে যাওয়া সম্ভব—এসব তথ্য কি অপরাধীদের জানা থাকে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটনের বিষয়টি আরও উদ্বেগের। কারণ এতে শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের ক্ষতি হয় না; সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। অপরাধীরা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার সাহস পায়, তাহলে সেটিকে সাধারণ ছিনতাই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “৩০০ ফিট সড়কে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ নিয়মিত টহল ও অভিযান চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িত কেউ ছাড় পাবে না। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।”
ওসির বক্তব্যে পুলিশের তৎপরতার বিষয়টি স্পষ্ট হলেও অপরাধ প্রতিরোধে আরও কিছু ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত পুলিশি টহল বাড়ানো, পর্যাপ্ত সড়কবাতি নিশ্চিত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি স্থাপন এবং সন্দেহজনক যানবাহনের ওপর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ৩০০ ফিট সড়কের নিরাপত্তাকে শুধু খিলক্ষেত থানার দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ সড়কটি দীর্ঘ এবং এর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন থানা ও প্রশাসনিক এলাকার সঙ্গে যুক্ত। একটি অংশে নজরদারি বাড়িয়ে অন্য অংশ ফাঁকা রাখলে অপরাধীরা সহজেই সেই দুর্বল জায়গা ব্যবহার করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে পুলিশের সাফল্য। কিন্তু একটি সড়কে একই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটতে থাকলে শুধু গ্রেপ্তার দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। প্রয়োজন অপরাধের সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তা বন্ধ করা।
৩০০ ফিট এখন রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা, বিমানবন্দরমুখী যোগাযোগ ও পূর্ব ঢাকার বিস্তৃত এলাকার সঙ্গে এই সড়কের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এ পথে চলাচল করেন।
তাই কয়েকটি ঘটনার কারণে পুরো সড়ককে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি বারবার ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেও উপেক্ষা করা যাবে না।
সাম্প্রতিক র্যাব পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা তাই কেবল একটি মামলার বিষয় নয়; এটি ৩০০ ফিট সড়কের সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি সতর্কবার্তা।
প্রশ্নটি এখন একটাই—৩০০ ফিটে অপরাধীরা বারবার সুযোগ পাচ্ছে কেন, আর সেই সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে কবে?
পড়ুন: হরমুজ প্রণালী ঘিরে ইরানের নতুন পদক্ষেপ
আর/


