ঢাকার ধামরাই উপজেলার নান্নার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি পদে পারভেজ আহমেদ তামিমের প্রার্থিতা ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক সম্পদ ইউনিয়ন যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কলেজছাত্র আফিকুল ইসলাম সাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। এমন তথ্য সামনে আসার পর তামিমের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ।
তবে তামিমের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বিভিন্ন সময়ে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে বাবার রাজনৈতিক পরিচয় বা কর্মকাণ্ডের দায় তাঁর ওপর বর্তায় না বলেও দাবি করেছেন তিনি।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নান্নার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি পদ প্রার্থী হিসেবে পারভেজ আহমেদ তামিমের নাম আলোচনায় আসে। এরপর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অতীত, ৫ আগস্টের আগে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয়তা এবং ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে তামিমের পুরোনো ছবি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আরও বাড়ে। এছাড়াও তামিমের বাবা আব্দুর রাজ্জাক সম্পদ নান্নার ইউনিয়ন যুবলীগের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং ঢাকা জেলা চালক লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন বলে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কলেজছাত্র আফিকুল ইসলাম সাদ নিহতের ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় আব্দুর রাজ্জাককে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে। গত ১৭ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে কিছুদিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। বাবার এই রাজনৈতিক পরিচয় ও মামলায় আসামি হওয়ার বিষয়টিই এখন ছেলে তামিমের ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণত পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন প্রার্থীর নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা এবং দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে তামিমের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে, ৫ আগস্টের আগে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতিতে কতটা সক্রিয় ছিলেন?
পারভেজ আহমেদ তামিমের দাবি, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিলেন। ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে বিভিন্ন সময় মিছিল-মিটিং ও দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তবে বিল্লাল হোসেনের বক্তব্যে তামিমের নিয়মিত রাজনৈতিক সক্রিয়তার বিষয়ে তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পল্লব হোসেনও অবগত আছেন বলে দাবি তামিমের। এ কারণে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের প্রশ্ন তামিম যদি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে থাকেন, তাহলে ৫ আগস্টের আগে তাঁর সাংগঠনিক সক্রিয়তার দৃশ্যমান প্রমাণ কতটা রয়েছে?
সম্প্রতি ধামরাই উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাফিজুর ইসলাম রবিনসহ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে পারভেজ আহমেদ তামিমের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কেক কাটার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ দলীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।
তবে কোনো ব্যক্তির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতার উপস্থিতি বা একসঙ্গে ছবি তোলাকে সরাসরি দলীয় পদ পাওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে দেখার কোন সুযোগ নেই। তামিমের প্রার্থিতা নিয়ে আগে থেকেই চলমান বিতর্কের কারণে ভিডিওটি স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের সঙ্গেও পারভেজ আহমেদ তামিমের পুরোনো ছবি রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তামিমের রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মীরা। নান্নার ইউনিয়ন বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা জানান, তামিম ছাত্রদলের রাজনীতিতে অতীতে কতটা সক্রিয় ছিলেন, সে বিষয়ে তাঁরা স্পষ্টভাবে অবগত নন।
তবে তাঁর বাবার আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় এবং ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি তাঁরা জানেন বলে জানিয়েছেন।
এবিষয়ে ধামরাই উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি রাফিজুল ইসলাম রবিন বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত দাওয়াত ছিল। আর কমিটি করার সময় যাচাই-বাছাই করেই ইউনিয়ন কমিটি করা হবে।
ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি তমিজ উদ্দিন বলেন, ফ্যাসিস্ট পরিবারের সদস্য কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ছিল না, এমন কাউকে কমিটিতে রাখার সুযোগ নেই। এ ধরনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধামরাই উপজেলা বিএনপির সহ-ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইউসুফ বলেন, এদের পরিবার আগে বিএনপির রাজনীতি করত। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বর্তমানে আবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় হয়েছে।
কমিটি গঠনের আগে যাচাই-বাছাইয়ের দাবি
নান্নার ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি পদে পারভেজ আহমেদ তামিমের প্রার্থিতা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের প্রশ্ন, ইউনিয়ন ছাত্রদলের কমিটি গঠনের আগে প্রার্থীদের রাজনৈতিক অতীত, ৫ আগস্টের আগে সাংগঠনিক ভূমিকা, দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কতটা যাচাই করা হবে?
তামিমের দাবি, তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন সময়ে দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মী তাঁর অতীত রাজনৈতিক সক্রিয়তার দৃশ্যমান প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ফলে নান্নার ইউনিয়ন ছাত্রদলের কমিটি গঠনের আগে তামিমের রাজনৈতিক অতীত ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা কতটা যাচাই করা হয়, সেটিই এখন স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়।
শেষ পর্যন্ত পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে নিজের সাংগঠনিক ভূমিকার প্রমাণ দিয়ে তামিম কতটা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেন এবং দলীয় যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা টিকে থাকে কি না, সেটিই এখন অপেক্ষার বিষয়।
পড়ুন:মেহেরপুরে ভারতীয় ফেয়াডিল সিরাপ উদ্ধার
ইমি/


