রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধীনে পিএইচডি (ডক্টর অব ফিলোসফি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. তাজুল ইসলাম। গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়। বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং লেখালেখির মাধ্যমে ইতোমধ্যে পরিচিতি পাওয়া এই বিচারকের পিএইচডি অর্জনে মেহেরপুরের বিচারাঙ্গন ও সংশ্লিষ্ট মহলে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে।
ড. মো. তাজুল ইসলামের গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে মান্ধাতা আমলের ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থা: বিকল্পের সন্ধানে’। গবেষণাটির ইংরেজি শিরোনাম ‘Archaic Quandary of Criminal Justice System in Bangladesh: Quest for the Alternative’। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত পুরোনো আইন, বিধি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে এর আধুনিকায়ন ও সংস্কারের সম্ভাব্য পথ নিয়ে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়।
গবেষণায় বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প ও সংস্কারের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো আইনগুলো বর্তমান সময়ের সামাজিক বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক বিচারিক ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় পুরোনো আইনগুলোকে বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি, বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানো, মামলাজট নিরসন এবং কার্যকর ও সময়োপযোগী বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
গবেষণার মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা-ভোসেতে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা গবেষণাকর্মটির বিষয়বস্তু, বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতার প্রশংসা করেন বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিনের বিচারিক অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত বাস্তব জ্ঞানকে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করায় গবেষণাটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় ড. মো. তাজুল ইসলাম মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে তাঁর শিক্ষক, গবেষক দল এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের কল্যাণে এবং বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।
বর্তমানে ড. মো. তাজুল ইসলাম মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইন, বিচারব্যবস্থা, মামলাজট এবং বিচারিক সংস্কার নিয়ে তিনি নিয়মিত গবেষণা ও লেখালেখি করে আসছেন।
১৯৮৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কুশোডাঙ্গা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মো. তাজুল ইসলাম। ২০০০ সালে এসএসসি এবং ২০০২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ২০০৬ সালে এলএলবি (অনার্স) এবং ২০০৭ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তিনি ক্রিমিনোলজি ও ক্রিমিনাল জাস্টিস এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন নিয়েও পড়াশোনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগ থেকে মাস্টার্স এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ থেকে বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ফলে আইন, অপরাধবিজ্ঞান, বিচারব্যবস্থা ও উন্নয়ন বিষয়ে তাঁর একাডেমিক জ্ঞান বিচারিক কর্মজীবনের সঙ্গে সমন্বিত হয়েছে।
তৃতীয় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৮ সালে সহকারী জজ হিসেবে খুলনা জেলা জজশিপে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বিচারিক কর্মজীবন শুরু হয়। কর্মজীবনের শুরু থেকেই বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে আসছেন।
পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ঢাকায় এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলা জজশিপে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা জজশিপেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
বিচারিক দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি এবং মামলাজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। বিশেষ করে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২২ সালে ৫৫টি হত্যা মামলা নিষ্পত্তি করে তিনি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হত্যা মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তাঁর এই ভূমিকা বিচারাঙ্গনে প্রশংসিত হয়।
বিচারিক কর্মজীবনের পাশাপাশি আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখিও চালিয়ে যাচ্ছেন ড. মো. তাজুল ইসলাম। মামলাজটমুক্ত, কার্যকর ও জনবান্ধব বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থী মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকে তিনি অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন।
আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা, বিচারিক সংস্কার ও মামলাজট নিরসনের বিষয়ে আগ্রহ তৈরিতেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। সমসাময়িক আইন, বিচারব্যবস্থা ও বিচারিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি নিয়মিত কলাম ও প্রবন্ধ লেখেন।
আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে তাঁর লেখা একাধিক বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘সাংবিধানিক আইনের সহজপাঠ’, শিশু আইনবিষয়ক ‘Juvenile Delinquency in Bangladesh: Identifying the Causes with Prevention and Rehabilitation’ এবং ‘বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা: স্বাধীনতার ৫০ বছর’। শিশু আইনবিষয়ক তাঁর বইটি বিশ্বের নয়টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইন বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখির কারণে ড. মো. তাজুল ইসলাম বিচারাঙ্গনের বাইরে আইন শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ পাঠকদের কাছেও পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তাঁর গবেষণার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে সময়োপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীদের জন্য দ্রুত ও কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
ব্যক্তিগত জীবনে ড. মো. তাজুল ইসলাম বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী আক্তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইংরেজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে কর্মরত। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বাবা আবুল হোসেন ছিলেন অধ্যাপক (অব.) এবং মা জামিলা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উচ্চতর গবেষণায় যুক্ত থেকে ড. মো. তাজুল ইসলাম দেশের বিচারব্যবস্থার নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণায় উঠে আসা সুপারিশ ও বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার ও আধুনিকায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারিক দায়িত্বের পাশাপাশি একজন বিচারকের উচ্চতর গবেষণা ও লেখালেখিতে যুক্ত থাকা বিচারব্যবস্থার জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পুরোনো আইন ও প্রক্রিয়াকে সময়োপযোগী করার বিষয়ে ড. মো. তাজুল ইসলামের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে তাঁর গবেষণার পথচলা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং ভবিষ্যতে দেশের বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন, মামলাজট নিরসন ও বিচারপ্রার্থী মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পড়ুন:আগামী পাঁচ বছরে ধামরাইকে আধুনিক ও মডেল শহর করতে চাই, মুরাদ
ইমি/


