দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩২০ শিশু।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।
এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৪৪। এ সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আরও ১০০ শিশু। সব মিলিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৪৪ শিশুর।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮১ শিশু। হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ২৩৯ শিশু। এ সময়ে ১ হাজার ১৪১ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ হাজার ৭৯ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে বুধবার পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ১৯৮। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ২৮২ জনের।
এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে মোট ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪২০ রোগী। চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬৫ জন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাইরাসজনিত এ রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক, যা শিশুদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ইনফেকশন ও মস্তিষ্কে প্রদাহ, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। অথচ রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, যা টিকা দেওয়ার মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
হামের ভয়াল থাবা
ষোড়শ শতাব্দীতে প্রয়োজনের তাগিদে পৃথিবীজুড়ে মানুষের যাতায়াত বাড়তে থাকে। ইউরোপীয় নাবিক ও অভিযাত্রীদের মাধ্যমে হামের জীবাণু এমন সব নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছাতে শুরু করে, যেখানে আগে কখনো এই রোগ ছিল না। ওই এলাকার মানুষের শরীরে এই নতুন ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো এন্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ফলে হাম সেখানে সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত হয়ে হাজির হয়।
উনিশ শতকের দিকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব ছিল রীতিমতো ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক। ১৮৪৬ সালে ফারো দ্বীপপুঞ্জে হামের একটি বড় মহামারি আঘাত হানে। সেখানে ডেনিশ চিকিৎসক পিটার প্যানাম গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন।
তিনি দেখতে পান, পুরো দ্বীপের প্রায় প্রতিটি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক কষ্ট পাচ্ছে। তবে তিনি সেখানে একটি যুগান্তকারী বিষয় লক্ষ্য করেন। যাঁরা ৬৫ বছর আগের একটি মহামারি হামে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন, তারা এই নতুন মহামারিতে আর দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হননি। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় যে, হাম থেকে বেঁচে ফিরলে মানুষের শরীরে এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে যায়।
এরপর ১৮৪৮ সালে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে একটি জাহাজের মাধ্যমে হাম রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হামের সঙ্গে যুক্ত হয় হুপিং কাশি। এই দুটি রোগ স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
তবে ইতিহাসের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি ঘটে ১৮৭৫ সালে ফিজি দ্বীপে। ফিজির রাজা ককোবাউ অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তিনি যখন তাঁর দেশে ফিরে আসেন, তখন রাজার মাধ্যমে পুরো ফিজিতে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফিজির মানুষের শরীরে হামের কোনো ইমিউনিটি না থাকায় মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে দ্বীপটির প্রায় ৪০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর এই সংখ্যাটি ছিল ফিজির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
টিকা আবিষ্কারের আগে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও হাম বিশ্বজুড়ে দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ ছিল। উন্নত দেশগুলোতে সেসময় চিকিৎসার কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষের জন্য হাম ছিল এক বিরাট আতঙ্কের নাম। হামের কারণে শিশুদের মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস হতো। এর ফলে হাজার হাজার শিশু চিরতরে অন্ধ হয়ে যেত বা মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি নিয়ে বেঁচে থাকত। কানের সংক্রমণ, ডায়রিয়া কিংবা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ শিশু ভর্তি হতো হাসপাতালে।
এই রোগের ভয়াবহতা থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্যই বিজ্ঞানীরা ১৯৫৪ সালে হামের টিকা আবিষ্কারের মিশন শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই যাত্রা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক বড় সাফল্যের জন্ম দেয়।
আবার কেন ফিরছে হাম
১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনে একটি স্কুলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ড. জন এন্ডারস ও ড. থমাস পিবলস ১১ বছরের এক কিশোরের রক্ত থেকে প্রথমবারের মতো হামের ভাইরাস আলাদা করেন। তাঁর নাম ‘ডেভিড এডমনস্টন’।
ডেভিডের নামানুসারে হামের ভাইরাসের নাম দেওয়া হয় ‘এডমনস্টন স্ট্রেইন’।
এরপর বিজ্ঞানী এন্ডারস ও তাঁর দল ভাইরাসটিকে দুর্বল করে ১৯৬৩ সালে হামের প্রথম টিকা আবিষ্কার করেন। পরে বিজ্ঞানী ড. মরিস হিলেম্যান এই টিকাকে আরও নিরাপদ ও উন্নত করতে ১৯৭১ সালে হাম, মাম্পস এবং রুবেলা রোগের জন্য একটিমাত্র ‘এমএমআর’ টিকা তৈরি করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০০০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই টিকার কারণে প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
তবে হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ায় সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় থাকতে হয়। ১৯৯৮ সালে একটি ভুয়া গবেষণায় দাবি করা হয়, এমএমআর টিকার কারণে শিশুদের অটিজম হয়। এই গুজবটি মিথ্যা প্রমাণিত হলেও এর কারণে অনেকেই টিকা নেওয়া বন্ধ করে দেন। ফলে উন্নত দেশগুলোতে হাম আবারও ফিরে আসে।
এছাড়া অতি সম্প্রতি বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোতে হামের প্রাদুর্ভাব অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই হামের আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যর খবর আসছে। এই সংকট মোকাবিলায় শিশুদের সঠিক সময়ে টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিন্তিত না হয়ে কী করে হামের জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়, সেই ব্যাপারে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পড়ুন : অনুমোদন পেল ৩ মেট্রোরেল প্রকল্প
সা/


