ওয়াশিংটন ডেস্ক: ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে আরও একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রাশিয়ার তেল ও গ্যাস ক্রেতা দেশগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন একটি নিষেধাজ্ঞা বিল পাস করেছে ওয়াশিংটন। তবে কঠোর অবস্থানের মধ্যেও নিজেদের পরমাণু জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মস্কোর সঙ্গে সীমিত বাণিজ্য বজায় রাখার জন্য বিলে বিশেষ ছাড় বা ‘কার্ভ-আউট’ রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ছাড়ের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার ইউরেনিয়াম-সংশ্লিষ্ট সরবরাহের ওপর ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
গত বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২-১৫৯ ভোটে ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংকশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট ২০২৬’ বিলটি পাস হয়। এর আগে সিনেটেও ৮৬-১১ ভোটে বিপুল ব্যবধানে বিলটি অনুমোদন পায়।
আইন অনুযায়ী, রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেনা অব্যাহত রাখা কিংবা মস্কোকে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করা দেশগুলোর পণ্যের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করতে পারবেন। এই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছে ভারত ও চীন।
তবে বিলটির উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এতে পরমাণু খাতের জন্য ব্যতিক্রমী ধারা রাখা হয়েছে। একদিকে রুশ রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা ‘রোসাটম’ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর ইউরেনিয়াম আমদানির ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, ‘সেকশন ১১৪’ বা ১১৪ নম্বর ধারায় দুটি বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে।
এই ছাড় অনুযায়ী, মার্কিন-রাশিয়া বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির আওতাধীন কার্যক্রম এবং মার্কিন পারমাণবিক চুল্লিতে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানির ক্ষেত্রে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ, রাশিয়ার সঙ্গে পরমাণু বাণিজ্যে এটি কোনো সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা নয়।
বিলে অন্তর্ভুক্ত পরমাণু ব্যতিক্রম বা ছাড়
আইনের ‘সেকশন ১১১’ বা ১১১ নম্বর ধারায় মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রাশিয়ার ইউরেনিয়াম আমদানিসংক্রান্ত একটি বিদ্যমান মার্কিন আইনের প্রয়োজনীয়তাগুলো বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে রোসাটম এবং এর যেকোনো সহযোগী বা উত্তরসূরি প্রতিষ্ঠানের ইউরেনিয়ামের কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
তবে ‘সেকশন ১১৪’ বা ১১৪ নম্বর ধারায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম বা ছাড় রাখা হয়েছে।
প্রথমত, পারমাণবিক শক্তি আইনের ‘সেকশন ১২৩’-এর অধীনে সম্পাদিত মার্কিন-রাশিয়া বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা চুক্তির আওতায় পরিচালিত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান মার্কিন আইনের আওতাভুক্ত পারমাণবিক চুল্লির জন্য নির্দিষ্ট কিছু স্বল্প-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি এবং বিশেষ ছাড় বা ওয়েভার জারি করা হয়েছে—এমন কিছু চিকিৎসা-আইসোটোপ আমদানিকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
এর অর্থ হলো, রাশিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রতিটি পরমাণু লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে না বিলটি। বরং, বিদ্যমান পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্ত করা হচ্ছে, যেখানে আগে থেকেই ছাড়, ওয়েভার বা বিশেষ অনুমতির প্রক্রিয়া রয়েছে।
মার্কিন পারমাণবিক বিদ্যুতে রাশিয়ার গুরুত্ব কেন এখনো বেশি?
এই ছাড় মার্কিন পরমাণু খাতের দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতার বিষয়টি প্রতিফলিত করে। ওয়াশিংটন মস্কোর ওপর সামগ্রিক অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করলেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে রাশিয়া এখনো বড় শক্তি হিসেবে রয়েছে।
২০২৫ সালে মার্কিন বেসামরিক পরমাণু পরিচালনাকারীরা ১২.৭১ মিলিয়ন সেপারেটিভ ওয়ার্ক ইউনিটস (SWU) সমৃদ্ধকরণ সেবা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রাশিয়ার অবদান ছিল ৩.২৮৪ মিলিয়ন SWU, যা মোট চাহিদার প্রায় ২৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সমৃদ্ধকরণ ছিল ২৩ শতাংশ। এ ছাড়া ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসও সমৃদ্ধকরণ সেবা সরবরাহ করেছে।
এই উপাত্তে যুক্তরাষ্ট্রের রাশিয়ানির্ভরতার চিত্র উঠে আসে। পারমাণবিক জ্বালানি অপরিশোধিত তেলের মতো নয়। অধিকাংশ বাণিজ্যিক চুল্লিতে ব্যবহারের উপযোগী করার আগে ইউরেনিয়ামকে রূপান্তর ও সমৃদ্ধকরণসহ বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। রাশিয়া একটি বড় সমৃদ্ধকরণ শিল্প গড়ে তুলেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দেশটির পরমাণু খাতকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে।
অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র এই নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করে আসছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ওয়াশিংটন রাশিয়ান ইউরেনিয়াম পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে কোম্পানিগুলোকে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিশেষ ছাড় বা ওয়েভারের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মার্কিন পরমাণু জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করতে ২.৭২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
বিলের পরবর্তী ধাপ ও প্রতিক্রিয়া
পরমাণু খাতের ছাড়ের পাশাপাশি বিলে রাশিয়ার কর্মকর্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ধনকুবের বা অলিগার্ক, জ্বালানি খাত এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত ট্যাঙ্কারের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরকে লক্ষ্য করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটি জানিয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে সমর্থনের জন্য রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনাই এই আইনের মূল উদ্দেশ্য।
প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়। এতে বেশিরভাগ রিপাবলিকান সদস্যের পাশাপাশি ৫৮ জন ডেমোক্র্যাট সদস্যও সমর্থন করেন। এর আগে সিনেটে এটি ৮৬-১১ ভোটে অনুমোদিত হয়েছিল।
আইনটি এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের জন্য তাঁর দপ্তরে যাচ্ছে। তিনি এতে স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করবেন—এমন সম্ভাবনা খুবই বেশি।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
পড়ুন: সৌদি আরবকে ৪৮ টি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
আর/


