বিজ্ঞাপন

স্মৃতি হারানোর আগে সচেতন হোন: বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া, নীরব এক স্বাস্থ্য সংকট

বিজ্ঞাপন

প্রতি বছর ২১ সেপ্টেম্বর সারা বিশ্বে পালিত হয় ‘বিশ্ব অ্যালঝেইমার্স দিবস’। অ্যালঝেইমার্স ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল (এডিআই)-এর নেতৃত্বে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বের ওপর, যার বার্তা হলো—যত আগে জানবেন, তত বেশি কিছু করার সুযোগ থাকবে। বার্তাটি নিছক প্রতীকী নয়, বরং বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি একটি জরুরি সতর্কবার্তা, কারণ এখানে ডিমেনশিয়া নিয়ে সচেতনতা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, আর রোগ নির্ণয় হয় দেরিতে, প্রায়ই লক্ষণ প্রকাশের বছরের পর বছর পরে।

সংখ্যাগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ডিমেনশিয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট জাতীয় জরিপ তুলনামূলক কম হলেও, বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত বলে ধারণা করা হয়, এবং এই সংখ্যা দ্রুতই বাড়ছে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি বারো জনের একজন কোনো না কোনো মাত্রার ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন, এবং পুরুষের চেয়ে নারীদের মধ্যে এই হার তুলনামূলক বেশি। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশের ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ, কিন্তু গড় আয়ু বেড়ে ৭০ বছরের বেশি হওয়ায় আগামী দুই দশকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এবং তার সঙ্গে ডিমেনশিয়া রোগীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন।

কেন দেরিতে ধরা পড়ে রোগ

আমাদের সমাজে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ কিংবা আচরণে পরিবর্তনকে স্বাভাবিক বার্ধক্যের অংশ ধরে নেওয়া হয়। ফলে পরিবারের সদস্যরা প্রাথমিক লক্ষণগুলো—যেমন সাম্প্রতিক ঘটনা ভুলে যাওয়া, চেনা পথ হারিয়ে ফেলা, সময়-স্থান নিয়ে বিভ্রান্তি কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা—নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যান অনেক দেরিতে, প্রায়ই যখন রোগ মধ্যম বা গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক লজ্জা ও ভুল ধারণা—অনেক পরিবার মনে করে প্রিয়জনের এই পরিবর্তন ‘মানসিক সমস্যা’ বা কলঙ্কজনক কিছু, তাই বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়। অথচ ডিমেনশিয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়—এটি মস্তিষ্কের একটি চিকিৎসাযোগ্য ও ব্যবস্থাপনাযোগ্য অবস্থা, যেখানে প্রাথমিক নির্ণয় রোগীর জীবনযাত্রার মান অনেকখানি উন্নত করতে পারে।

সেবাব্যবস্থার সংকট

বাংলাদেশে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন ও ডিমেনশিয়া কেয়ারে প্রশিক্ষিত জনবল এখনো সীমিত। ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জেলা শহরে নিউরোলজিস্ট বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকলেও ডিমেনশিয়া নির্ণয় ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত জনবল নেই বললেই চলে। মেমোরি ক্লিনিক, ডে-কেয়ার সেন্টার কিংবা প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার সহায়তা মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক এবং সীমিত পরিসরে। আলঝেইমার্স সোসাইটি অব বাংলাদেশ (এএসবি)-এর মতো কয়েকটি বেসরকারি উদ্যোগ ২০০৬ সাল থেকে সচেতনতা তৈরি ও প্রশিক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত ডিমেনশিয়া নীতিমালা এখনো প্রণয়ন হয়নি। ফলে রোগনির্ণয় থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা পর্যন্ত পুরো দায়িত্ব বর্তায় পরিবারের ওপর, যা অনেক ক্ষেত্রেই আর্থিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।

পরিবারের ওপর চাপ

আমাদের সামাজিক কাঠামোয় প্রবীণ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব মূলত পরিবারের ওপরই থাকে, যা একদিকে যেমন মমতার প্রকাশ, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে কেয়ারগিভারদের ওপর বিপুল মানসিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করে। সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমেনশিয়া বা পারকিনসন্স রোগীর পরিবারের সদস্যরা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় মানসিক ক্লান্তি ও উদ্বেগে ভোগেন, বিশেষ করে যখন তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা সহায়তা ছাড়াই একা এই দায়িত্ব সামলান। কেয়ারগিভারদের প্রশিক্ষণ, মানসিক সহায়তা এবং মাঝেমধ্যে বিরতি পাওয়ার সুযোগ তাই রোগীর যত্নের মতোই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, যা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

এখনই যা করণীয়

প্রথমত, পরিবারের প্রবীণ সদস্যের আচরণ বা স্মৃতিশক্তিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা স্বাভাবিক বার্ধক্য ভেবে উপেক্ষা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত জেরিয়াট্রিক ও ডিমেনশিয়া কেয়ারে জনবল প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জেলা পর্যায়ে মেমোরি ক্লিনিক চালু করা। তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে হবে, যাতে পরিবারগুলো লজ্জা না পেয়ে খোলাখুলি সাহায্য চাইতে পারে। সবশেষে, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক ব্যায়াম, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মতো জীবনযাপনের অভ্যাসগুলো ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে।

শেষ কথা

এ বছরের বিশ্ব অ্যালঝেইমার্স দিবসের বার্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সময়মতো রোগ নির্ণয় শুধু চিকিৎসার জন্য নয়, বরং রোগী ও তাঁর পরিবারকে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যও জরুরি। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বাস্তবতায় ডিমেনশিয়াকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। পরিবার, চিকিৎসক, নীতিনির্ধারক ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সম্ভব একটি ডিমেনশিয়া-বান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ভুলে যাওয়া রোগেও কেউ একা হয়ে পড়বেন না।

লেখক : বার্ধক্য বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, উপ-পরিচালক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ রিটায়ারমেন্ট হোমস

পড়ুন : দিল্লি বিমানবন্দর থেকে সীমান্তের শূন্যরেখা: বাংলাদেশকে কি চাপের মুখে রাখা হচ্ছে?

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন