সুনামগঞ্জ শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোতে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকায় মলিন হয়ে পড়েছে শহরের সৌন্দর্য। বিশেষ করে শহরের পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাটি দীর্ঘদিন ধরে ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা ও বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য এনে এখানে ফেলায় ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এতে পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বাড়ছে।
পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি পুকুর, ঐতিহ্য জাদুঘর ও শাপলা চত্বর। গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনার পাশে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় পরিবেশ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাজুড়ে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য এনে সেখানে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় এসব বর্জ্য থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ময়লার স্তূপের আশপাশে মাছি-মশার উপদ্রবও বেড়েছে। বৃষ্টির পানি ময়লার সঙ্গে মিশে দুর্গন্ধ আরও তীব্র হচ্ছে।
শাপলা চত্বর শহরের অন্যতম পরিচিত ও জনসমাগমপূর্ণ স্থান। বিকেলে এখানে পথচারী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ কিছুটা সময় কাটান। কিন্তু ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধের কারণে চত্বরের আশপাশের পরিবেশও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে জাদুঘরের সামনেও। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থানে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ও অবস্থান ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গা নয়, শহরের বিভিন্ন ডাস্টবিনেও দিনের পর দিন ময়লা পড়ে থাকতে দেখা গেছে। নির্ধারিত সময়ে বর্জ্য অপসারণ না করায় কোথাও কোথাও ডাস্টবিন উপচে সড়কের পাশেও আবর্জনা ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ময়লা পড়ে থাকায় শুধু দুর্গন্ধই নয়, মশা-মাছির উপদ্রবও বেড়েছে। এতে আশপাশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানের পাশে এভাবে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
উকিলপাড়ার বাসিন্দা মো. জহুর মিয়া বলেন, শহরের মাঝখানে স্কুল ও মানুষের চলাচলের রাস্তার পাশে ময়লার স্তূপ রাখা হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে ওই এলাকা দিয়ে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। পৌরবাসীর দাবি, ময়লার স্তূপগুলো দ্রুত সরিয়ে অন্যত্র নেওয়া হোক। শহরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে এ কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পৌর কলেজের স্টাফ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক কাঞ্চন বৈদ্য বলেন, এখানে পুরাতন পৌরসভা ও পৌর কলেজের পুরাতন ক্যাম্পাস ছিল। শহরের প্রাণকেন্দ্র পুরাতন কোর্ট ও শাপলা চত্বরের পাশে এবং সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পুকুরসংলগ্ন এই জায়গাটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থান। অথচ বর্তমানে এটি পৌরসভার ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন শহরের বাসাবাড়ির ময়লা এখানে ফেলা হচ্ছে। এতে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশের রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় দুর্গন্ধে বমি আসার মতো অবস্থা হয়। অসহ্য দুর্গন্ধের কারণে শাপলা চত্বরেও এখন স্বাভাবিকভাবে বসে সময় কাটানো যায় না।
কাঞ্চন বৈদ্য আরও বলেন, শহরের প্রাণকেন্দ্রের এমন নান্দনিক ও ঐতিহ্যবাহী জায়গায় কেন ময়লা ফেলা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ, দ্রুত ময়লা অপসারণ করে এই জায়গাটিকে ময়লার ভাগাড় থেকে রক্ষা করুন।
হাওয়ার বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, পুরাতন পৌরসভা ভবন ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের কথা দীর্ঘদিন ধরে শোনা গেলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। জনগুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানকে কী পরিকল্পনায় ময়লার অস্থায়ী স্টেশন করা হলো, সেটি পৌরবাসীর প্রশ্ন।
তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নিয়ে ভবনটি অপসারণ করা উচিত হয়নি। জায়গাটি একসময় পৌর কলেজ, কর্মকর্তাদের আবাসন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখরিত ছিল। এখন মানুষ নাকে রুমাল দিয়ে চলাচল করেন।
হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কুদরত পাশা বলেন, শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ঐতিহ্য জাদুঘর ও শাপলা চত্বরে মানুষ বিকেলে ঘুরতে আসে। অথচ এর পাশেই পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। এতে মানুষজন এখানে আসতে অনাগ্রহী হচ্ছেন। শাপলা চত্বরের পাশেই জুবিলী স্কুলের হোস্টেল। ময়লার দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়ও বিঘ্ন ঘটছে। শহরের ভেতরে ময়লা না ফেলে নির্ধারিত স্থানে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক খলিল রহমান বলেন, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পুরাতন পৌরসভা ভবনের জায়গাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর আশপাশে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়, জাদুঘর ও শাপলা চত্বর রয়েছে। এখানে ময়লা ফেলার কারণে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং রোগবালাই ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে পরিকল্পিতভাবে বর্জ্য অপসারণ করা উচিত।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম কয়েস বলেন, পুরাতন পৌরসভা ভবনের স্থানে ময়লার ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি দুঃখজনক। তবে ওই স্থানে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগিরই এখানে দৃষ্টিনন্দন মার্কেট ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হবে। পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। ময়লার ভাগাড়টি সরিয়ে নিতে ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় ‘২৫০০’ নামে একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ প্রকল্পে সলিড ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনার জন্য বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি চুক্তি পর্যায়ে আছে। একজন প্রকৌশলী এ প্রকল্পের আওতায় বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন। প্রকল্পটি শুরু হলে পুরো শহরের সলিড ওয়েস্ট একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।
পড়ুন : অনিশ্চয়তার দিন শেষ, এমপি ধলুর উদ্যোগে ঘর পেলেন দুই অসহায় পরিবার


