বিজ্ঞাপন

সমুদ্রের ১০ মিটার গভীরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে চীনা বিজ্ঞানীদের সাফল্য

বিজ্ঞাপন

সমুদ্রের পানির ১০ মিটার বা প্রায় ৩৩ ফুট গভীরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি পরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন চীনা বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের দাবি, খোলা সমুদ্রে পানির নিচে স্থাপন করা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরীক্ষায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বিশেষভাবে তৈরি পেরোভস্কাইটভিত্তিক সোলার প্যানেল ব্যবহার করে সমুদ্রের অল্প আলো থেকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সেই বিদ্যুৎ দিয়ে ব্যাটারি চার্জ ও এলইডি বাতি জ্বালাতে সক্ষম হয়েছেন তারা।

চীনের ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এ গবেষণা পরিচালনা করেন। পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করতে তারা দক্ষিণ চীন সাগরের ওয়েইঝো দ্বীপের কাছে সমুদ্রের পানিতে পরীক্ষা চালান। গবেষণার ফলাফল ১১ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞান সাময়িকী জুল (Joule)-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে এর আগেও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে সেসব গবেষণার বড় অংশই অগভীর পানিতে সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণত দুই মিটার বা তার কম গভীরতায় এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্রে বাস্তব প্রয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে অনেক প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল। নতুন গবেষণায় ১০ মিটার গভীরতায় সোলার প্যানেল কার্যকরভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারায় সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ওয়েন-হুয়া ঝাং জানান, পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো পর্যাপ্ত সূর্যের আলো পাওয়া। পানির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে শোষিত হয়ে যায়। বিশেষ করে লাল আলোর বড় একটি অংশ পানির ওপরের স্তরেই শোষিত হয়। ফলে গভীরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলো কমে আসে এবং প্রচলিত সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।

গবেষকেরা এই সমস্যার সমাধানে পেরোভস্কাইটভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। তাদের তৈরি সোলার প্যানেলে সীসা-হ্যালাইড পেরোভস্কাইট নামের বিশেষ অর্ধপরিবাহী উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে পলিহেক্সামেথিলিন গুয়ানিডিন হাইড্রোক্লোরাইড নামের একটি পলিমার যুক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই উপাদান সৌর প্যানেলের ভেতরে ইলেকট্রন ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।

পানির নিচে সূর্যের আলো সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায় না। তবে পানির গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোর গঠন পরিবর্তিত হয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫ থেকে ১০ মিটার গভীরতায় লাল আলোর তুলনায় নীল ও সবুজ আলোর উপস্থিতি বেশি থাকে। নতুন সোলার প্যানেলগুলোকে এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য ৪০০ থেকে ৬০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কাজে লাগানোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে পানির ওপরের তুলনায় আলো অনেক কম থাকলেও প্যানেলটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

গবেষণার অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা রোবটের সাহায্যে প্রায় ১১৫ বর্গসেন্টিমিটার আয়তনের সোলার প্যানেল সমুদ্রের পানির বিভিন্ন গভীরতায় স্থাপন করেন। দক্ষিণ চীন সাগরের ওয়েইঝো দ্বীপের কাছে দুই, ছয় এবং ১০ মিটার গভীরতায় পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা চালানো হয়। এর মাধ্যমে গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌর প্যানেলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।

পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, দুই মিটার গভীরতায় সোলার প্যানেলটি ১ হাজার ৪১৬ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। ছয় মিটার গভীরতায় বিদ্যুৎ সংগ্রহের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৭৫২ মিলিওয়াট-ঘণ্টায়। আর ১০ মিটার গভীরতায় প্যানেলটি ৩২৪ মিলিওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে। অর্থাৎ গভীরতা বাড়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমলেও ১০ মিটার গভীরতাতেও প্যানেলটি কার্যকরভাবে শক্তি উৎপাদন করতে পেরেছে।

উৎপাদিত বিদ্যুৎ শুধু পরিমাপ করেই গবেষণা শেষ করেননি বিজ্ঞানীরা। তারা এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে একটি ব্যাটারি চার্জ করেন এবং একই শক্তি দিয়ে একটি এলইডি লাইট জ্বালান। এর মাধ্যমে সমুদ্রের পানির নিচে উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তার একটি প্রাথমিক প্রদর্শন করা হয়।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, নতুন ধরনের এই সোলার প্যানেল প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর্যন্ত কাজ করতে পারে। তবে সমুদ্রের পানিতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের ক্ষেত্রে লবণাক্ততা, চাপ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, জৈব আবরণ এবং অন্যান্য পরিবেশগত প্রভাব কতটা কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে, তা নিয়ে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হতে পারে এমন সব যন্ত্রে, যেগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রের নিচে অবস্থান করে এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। বর্তমানে সমুদ্রের তলদেশে থাকা বিভিন্ন সেন্সর, পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় ডিভাইসকে বিদ্যুৎ দিতে ব্যাটারি অথবা অন্য কোনো শক্তির উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো যন্ত্রটি তুলে এনে রক্ষণাবেক্ষণ বা ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হয়।

পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি কার্যকরভাবে উন্নত করা গেলে এ ধরনের রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন কমতে পারে। সমুদ্রের তলদেশে স্থির সেন্সর, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের যন্ত্র এবং অন্যান্য স্বয়ংক্রিয় ডিভাইসকে দীর্ঘ সময় চালানোর ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

এ ছাড়া ভবিষ্যতে সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার হতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পানির নিচে দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন হয়, সেখানে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সমুদ্রের তাপমাত্রা, পানির গুণগত মান, সামুদ্রিক প্রাণীর চলাচল কিংবা পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত সেন্সরগুলোতে এ ধরনের প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে গবেষণাটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ১০ মিটার গভীরতায় সফলতা পাওয়া গেলেও আরও গভীর পানিতে একই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর থাকবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পাশাপাশি বড় আকারে সৌর প্যানেল তৈরি, সমুদ্রের ঢেউ ও স্রোতের প্রভাব মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে যন্ত্রের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

তারপরও গবেষকদের এই সাফল্য পানির নিচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। অল্প আলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে সমুদ্রের নিচে থাকা বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে। গবেষকদের আশা, আরও উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষার মাধ্যমে পেরোভস্কাইটভিত্তিক এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে স্বয়ংসম্পূর্ণ সামুদ্রিক শক্তিব্যবস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পড়ুন:এআই এর নাম পরিবর্তনে ট্রাম্পের নতুন প্রস্তাব

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন