ভূরাজনৈতিক বিভাজনের কারণে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবেই বিশ্বের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে, বাড়ছে যুদ্ধ এবং সংঘাতগুলো ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে মহাসচিব হিসেবে নিজের শেষ ভাষণ দেওয়ার আগের দিন সোমবার আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে বিশ্বের বিভিন্ন সামরিক সংঘাত এবং এসব সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, বিভিন্ন যুদ্ধে ‘পরাশক্তি’ এবং নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সম্পৃক্ততার কারণে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সংকট তৈরি হয়েছে।
তার মতে, এর ফল হিসেবে এক ধরনের দায়মুক্তির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মাঝারি শক্তির দেশগুলোও মনে করছে, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারবে এবং এর জন্য কোনো পরিণতি ভোগ করতে হবে না।
যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে খাদ্যপ্রাপ্তি, জ্বালানির মূল্য এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর পড়া প্রভাবের বিষয়টিও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষিপণ্য, সার ও জ্বালানি রপ্তানিতে কৃষ্ণসাগরকেন্দ্রিক যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট, লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালির সমস্যা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে তেল স্থাপনায় হামলার বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে।
এসব পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাব বিশ্বের বহু অর্থনীতির ওপর “ধ্বংসাত্মক” প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সুদের হার ও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও উন্নয়নশীল বিশ্বের মানুষ ক্রমেই “মরিয়া পরিস্থিতির” মধ্যে পড়ছে। জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সারের সংকটও তাদের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করছে।
জাতিসংঘে সংস্কারের তাগিদ
পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতিসংঘের সাবেক শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার গুতেরেস ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি জাতিসংঘের মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। তার বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা।
তার উত্তরসূরির নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে গুতেরেস মনে করেন, একাধিক সংকটে জর্জরিত জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর রাখতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। গুতেরেস বলেন, নিরাপত্তা পরিষদ এখনো মূলত “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে”।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বাস্তবতার সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোর সামঞ্জস্য নেই—এমন বিবেচনা থেকেই দীর্ঘদিন ধরে এর সংস্কারের দাবি রয়েছে।
পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন?
গুতেরেসের উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং ইকুয়েডরের কূটনীতিক মারিয়া ফের্নান্দা এসপিনোসা।
জাতিসংঘের মহাসচিব পদে কোনো প্রার্থীকে সুপারিশ করতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্য—চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র—এর কোনো একটি দেশের ভেটোও এড়াতে হয়।
নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে চূড়ান্ত ভোটের মাধ্যমে নতুন মহাসচিব নির্বাচিত হন।
সূত্র: আলজাজিরা
পড়ুন: তেলের দামে বাজার-গণপরিবহনে অস্থিরতা, চাপে জনজীবন
আর/


