এতদিন মুষ্টিযুদ্ধ মানেই ছিল রিংয়ের ভেতরে মানুষ বনাম মানুষের লড়াই। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দুই বক্সারের ঘুষি, কৌশল আর শারীরিক সক্ষমতার লড়াইই ছিল এই খেলার মূল আকর্ষণ। তবে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে সেই চেনা দৃশ্যেই যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। এবার মানুষের সঙ্গে সরাসরি মুষ্টিযুদ্ধে নামতে দেখা গেল একটি হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটকে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে আয়োজন করা হয় মানুষ বনাম হিউম্যানয়েড রোবটের একটি অভিনব মুষ্টিযুদ্ধ। এই লড়াইয়ের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটি দেখে অনেকেই বলছেন, দৃশ্যটি যেন কোনো হলিউডের সায়েন্স ফিকশন সিনেমার অংশ।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘আরইকে’ এই অভিনব লড়াইয়ের আয়োজন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় ৬ ফুট উচ্চতার একটি হিউম্যানয়েড রোবটের মুখোমুখি হয়েছেন মার্কিন ইনফ্লুয়েন্সার ফ্র্যাঙ্কি লাপেনা। একটি ফাইটিং কেজের ভেতরেই হয় এই লড়াই।
ভিডিওর শুরুতে দেখা যায়, লড়াইয়ের প্রস্তুতি হিসেবে রিংয়ের ভেতরে রোবটটিকে ওয়ার্ম-আপ করতে দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, ফ্র্যাঙ্কি লাপেনাও প্রস্তুত হয়ে রোবটটির মুখোমুখি অবস্থান নেন। এরপর শুরু হয় অভিনব এই মুষ্টিযুদ্ধ।
লড়াই শুরু হওয়ার পর প্রথমদিকে ফ্র্যাঙ্কি লাপেনাকে রোবটটিকে লক্ষ্য করে একের পর এক ঘুষি ছুড়তে দেখা যায়। রোবটটিও পাল্টা আক্রমণে যায়। ঘুষির পাশাপাশি রোবটটিকে লাথি মারতেও দেখা যায়। একপর্যায়ে রোবটের আঘাতে লাপেনা রিংয়ের এক প্রান্তে ছিটকে পড়েন।
পুরো লড়াইটি দেখে অনেকের কাছেই বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। কারণ, সাধারণত রোবটকে মানুষের তৈরি একটি যন্ত্র হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু এই ঘটনায় একটি মানবসদৃশ রোবটকে মানুষের মতো শারীরিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা গেছে। ফলে প্রযুক্তি ও রোবোটিক্স নিয়ে আগ্রহী মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রোবোটিক্স প্রতিষ্ঠান ‘আরইকে’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছে, এটি মানুষ বনাম হিউম্যানয়েড রোবটের প্রথম এমন লড়াই। প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টিকে ‘মানুষ বনাম টার্মিনেটর’ ধাঁচের একটি লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে ফ্র্যাঙ্কি লাপেনা তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে লড়াই করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই লড়াইয়ের পেছনে শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্য ছিল না বলেও জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটির একটি ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি কমব্যাট গেম তৈরির কাজের অংশ হিসেবে এই আয়োজন করা হয়। পরিকল্পিত এই গেমে মানুষ দূর থেকে হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ন্ত্রণ করে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারবেন।
অর্থাৎ, রোবটটি নিজে থেকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই করেনি; বরং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এর গতিবিধি পরিচালনা করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তব জগতের রোবটকে ভার্চুয়াল গেমের সঙ্গে যুক্ত করার একটি নতুন সম্ভাবনা দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনদের মধ্যেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ ভবিষ্যতে খেলাধুলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে রোবটের প্রতিযোগিতা হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ রোবটের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করেছেন।
একজন মন্তব্যকারী জানতে চেয়েছেন, ভবিষ্যতে কি এমন আরও প্রতিযোগিতা দেখা যাবে, যেখানে মানুষের পাশাপাশি রোবটও বিভিন্ন খেলায় অংশ নেবে? অন্যদিকে কেউ কেউ রোবটটির সক্ষমতা নিয়ে মজার মন্তব্যও করেছেন। এমনকি একজন প্রশ্ন তুলেছেন, একজন পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধার মুখোমুখি হলে রোবটটি কেমন পারফরম্যান্স করবে।
প্রযুক্তিবিদদের কাছে এ ধরনের আয়োজনের গুরুত্বও রয়েছে। হিউম্যানয়েড রোবটের চলাফেরা, ভারসাম্য, প্রতিক্রিয়ার গতি এবং দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরীক্ষামূলক আয়োজন কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে বিনোদন জগতের সঙ্গে রোবোটিক্স প্রযুক্তির সমন্বয়ের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
তবে মানুষ ও রোবটের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতে কতটা জনপ্রিয় হবে, তা এখনই বলা কঠিন। রোবটের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বিনোদন এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে এর ব্যবহার নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, রিমোট কন্ট্রোল প্রযুক্তি এবং হিউম্যানয়েড রোবট—এই তিন প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হতে পারে নতুন ধরনের বিনোদনমূলক অভিজ্ঞতা।
সান ফ্রান্সিসকোর এই লড়াই তাই শুধু একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী নয়, বরং মানুষ ও রোবটকে ঘিরে ভবিষ্যতের বিনোদন ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সেই কৌতূহলকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে এমন মানুষ বনাম রোবট প্রতিযোগিতা কেবল পরীক্ষামূলক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি তা নতুন কোনো জনপ্রিয় বিনোদন বা ক্রীড়া ইভেন্টের রূপ নেয়।
পড়ুন:পাসপোর্ট হারানো বা চুরি: প্রথমবার নেই দণ্ড ফি, দ্বিতীয়বার থেকে ১০ হাজার
ইমি/


