ভারতের উত্তরপ্রদেশের গ্রেটার নয়ডায় যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে একটি এসি স্লিপার বাসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। বুধবার গভীর রাতে জেওয়ার থানা এলাকার দয়ানতপুর গ্রামের কাছে এই দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বাসটিতে প্রায় ৩৫ জন যাত্রী ছিলেন। আগুন দ্রুত পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ায় বেশ কয়েকজন যাত্রী বের হতে পারেননি। নিহতদের মধ্যে নারী ও অন্যান্য যাত্রীও রয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাসটি দিল্লি/নয়ডা এলাকা থেকে উত্তরপ্রদেশের মহোবার উদ্দেশে যাচ্ছিল। বাসটির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল বিহারের। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের দয়ানতপুর গ্রামের কাছে চলন্ত অবস্থায় বাসে আগুনের সূত্রপাত হয়। যাত্রীরা প্রথমে পোড়া গন্ধ ও ধোঁয়া টের পান। এরপর তারা চালককে বাস থামানোর জন্য বলেন। চালক বাসটি এক্সপ্রেসওয়ের পাশে থামানোর চেষ্টা করলেও এর মধ্যেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
আগুন লাগার পর বাসের ভেতরে মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘন ধোঁয়ায় যাত্রীদের শ্বাস নেওয়া ও বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কয়েকজন যাত্রী বাসের জানালা দিয়ে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে প্রাণ বাঁচান। অন্যরা দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বাসের ভেতরের কয়েকজন যাত্রী আটকা পড়েন। পরে তাদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ও যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। আগুন নেভাতে দমকল বাহিনীর একাধিক গাড়ি ঘটনাস্থলে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর বাসটি সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যাওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার কারণে কিছু সময়ের জন্য এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচলও ব্যাহত হয়। J
ঘটনার পর বাসের চালক ও কন্ডাক্টর ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের সন্ধানে তল্লাশি শুরু হয়েছে। জেওয়ার থানার পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগুন ঠিক কীভাবে শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। বাসের বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, ইঞ্জিন, এসি ইউনিটসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কয়েকটি প্রতিবেদনে বাসের ভেতরে আতশবাজি বা দাহ্য কোনো সামগ্রী থাকার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এটি এখনো পুলিশের তদন্তে নিশ্চিত হওয়া তথ্য নয়। ফলে আগুনের কারণ হিসেবে এটিকে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্ত শেষ হওয়ার পরই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং কোনো ধরনের অবহেলা বা নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া এক যাত্রী সংবাদ সংস্থা এএনআইকে জানান, তিনি বাসে ঘুমিয়ে ছিলেন। হঠাৎ একজন তাকে ঘুম থেকে তুলে জানান যে বাসে আগুন লেগেছে। এরপর যাত্রীরা সবাই দ্রুত বের হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু প্রচণ্ড ধোঁয়ার কারণে বের হওয়া সহজ ছিল না। কোনোভাবে তিনি এবং অন্য কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে বের হতে সক্ষম হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাসটি যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিল এবং আগুন লাগার পর পরিস্থিতি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী জানান, ঘুম থেকে ওঠার পর তিনি দেখতে পান চারদিকে মানুষের ভিড় ও ধোঁয়া। পরিস্থিতি এতটাই আতঙ্কজনক ছিল যে তিনি নিজের জিনিসপত্র নেওয়ার সুযোগ পাননি; শুধু মোবাইল ফোন নিয়ে বাস থেকে বেরিয়ে আসেন। ভারী ধোঁয়া ও যাত্রীদের হুড়োহুড়ির কারণে পেছনের দিকে থাকা যাত্রীদের বের হতে আরও বেশি সমস্যা হয়েছিল বলে তিনি জানান।
এদিকে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও দূরপাল্লার স্লিপার বাসে অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে চলন্ত অবস্থায় আগুন লাগলে অল্প সময়ের মধ্যে বাসের ভেতর ধোঁয়া ও আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই জরুরি দরজা, জানালা, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিয়মিত পরিদর্শন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘটনায় তা নতুন করে সামনে এসেছে।
পুলিশের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের সুনির্দিষ্ট কারণ, কারও গাফিলতি ছিল কি না এবং বাসে কোনো নিষিদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ সামগ্রী বহন করা হচ্ছিল কি না—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তবে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের এই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত ৯ জনের প্রাণহানি ইতিমধ্যেই এলাকায় গভীর শোকের পরিবেশ তৈরি করেছে।
পড়ুন:আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
ইমি/


