বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং সন্দেহে এক রাতে আটক ৬২৪

কুমিল্লার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের বিরুদ্ধে একযোগে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। বুধবার রাতে চালানো এ অভিযানে নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে সন্দেহজনক ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া কর্মকর্তা) লুৎফর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উঠতি বয়সী কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

অভিযানের অংশ হিসেবে জেলার ১৮টি থানার পুলিশ একযোগে মাঠে নামে। কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও যেসব স্থানে কিশোর গ্যাং ও বখাটেদের উৎপাতের অভিযোগ রয়েছে, সেসব স্থানেও অভিযান চালানো হয়। জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অভিযানে সরাসরি অংশ নেন।

পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানে আটক ৬২৪ জনের অতীত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং বিভিন্ন এলাকায় বখাটেদের উৎপাত নিয়ন্ত্রণে রাখতে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ বিবেচনা ও অতীত অপরাধের রেকর্ড অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়া চলমান।’

সারাদেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য অন্তত ৪ হাজার ২৫০ জন।

এর মধ্যে ঢাকা মহানগরে রয়েছে ১৫৯টি গ্যাং, যেগুলোর সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৮১২ জন। ঢাকার বাইরে সক্রিয় ২২৭টি গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। এছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলায় রয়েছে আরও ৮১টি কিশোর গ্যাং।

এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক সেবন ও কারবার, হামলা এবং সহিংসতাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি খুনের মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন অপরাধে কিশোরদের ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও তাদের ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়।

চলতি বছরের এপ্রিলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে প্রতিদ্বন্দ্বী কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে ইমন ওরফে অ্যালেক্স ইমনকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় করা মামলার এজাহারে ২১ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনকে আসামি করা হয়।

এর আগে মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী ও বেড়িবাঁধ এলাকায় সক্রিয় ‘ব্রেভ ডেঞ্জার স্ট্রং কিং’ (বিডিএসকে) নামের একটি গ্যাংয়ের সদস্যদের চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, যৌন হয়রানি, মাদক সেবন ও মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তৎকালীন র‍্যাবের ভাষ্য, গ্যাংটির সদস্যরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবেও কাজ করত।

আরেক ঘটনায় র‍্যাব জানিয়েছিল, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একটি গ্যাংয়ের সদস্যরা একাকী পথচারীদের ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিত। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষেও জড়াত তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক কিশোরের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার শুরু হয় আড্ডা, মাদক সেবন, ছোটখাটো চুরি কিংবা মারামারি থেকে। পরে সংঘবদ্ধ হওয়ার সঙ্গে তাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা তৈরি হয়। এ সময় তাদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ও মাদকও চলে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও দুঃসাহস প্রদর্শনের প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে অপরাধে উৎসাহ জোগায়।

এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা কিশোরদের অপরিপক্বতা ও আইনি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘দেশের কিশোরদের একটি অংশ ক্রমেই অপরাধ ও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক সেবন ও কারবার, চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে হত্যার মতো গুরুতর অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক দিকনির্দেশনা, নজরদারি ও সহায়তার অভাবে অনেক কিশোর অপরাধের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। তাদের অসহায়ত্ব ও সামাজিক অনগ্রসরতাকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী ও অপরাধী ব্যক্তি কিশোরদের সংগঠিত করে গ্যাং গড়ে তুলছে এবং বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু কিশোরদের গ্রেফতার বা আইনের আওতায় আনার মধ্যে সমাধান সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। যারা তাদের ব্যবহার করে গ্যাং গড়ে তুলছে ও অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, তাদেরও চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কাউন্সেলিং, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক তদারকি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক উদ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই তাদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’

কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন।

তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। চিহ্নিত গ্যাং ও তাদের সদস্যদের তথ্য সংগ্রহ করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।’

পড়ুন : মাদক-জুয়া প্রতিরোধে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন