নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলা। এখান থেকে প্রতি বছর শত শত যুবক নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। প্রবাসে গিয়ে তাদের বড় অংশেরই লক্ষ্য থাকে ‘চালক’ বা ড্রাইভার হিসেবে সম্মানজনক কর্মসংস্থান। এই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণের অভাব। কেবল একটি প্রশিক্ষণ গাড়ি বা উপযুক্ত ভেন্যুর অভাবে পিছিয়ে পড়ছেন উপজেলার হাজারো বেকার যুবক।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ‘দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক চমৎকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রাথমিকভাবে ৬৪টি জেলায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগটি প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) সম্প্রসারিত হয়েছে। তিন মাস মেয়াদি কোর্সে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) লাইসেন্স পেতেও সর্বাত্মক সহায়তা করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য ১৯২ জন প্রশিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলমান। উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ গাড়ি না থাকায় সরকারি সুবিধার ছিটেফোঁটাও পৌঁছাচ্ছে না কেন্দুয়ার বাসিন্দাদের কাছে।
নিজ এলাকায় সরকারি সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে এসব বিদেশগামী যুবককে ছুটতে হয় নেত্রকোনা জেলা শহর কিংবা ময়মনসিংহে। সেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রাপ্তি মিলিয়ে তাদের গুনতে হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে যাতায়াত ও থাকা-খাওয়ার বাড়তি খরচ তো রয়েছেই। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এত টাকা খরচ করেও অনেক সময় দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হতে হয় সাধারণ মানুষদের।
স্থানীয় বিদেশগামী যুবক মোহাম্মদ রবিন খানের কথায় উঠে আসে সেই হতাশা ও প্রত্যাশার সুর। তিনি বলেন, “আমরা চাই না আমাদের ছেলেরা দালালের খপ্পরে পড়ুক। সরকারি প্রশিক্ষণ ও সরকারি লাইসেন্স নিয়ে যেন তারা বিদেশে যেতে পারে, এটাই আমাদের প্রধান চাওয়া।”
হতাশার মাঝেও আশায় বুক বাঁধছেন কেন্দুয়াবাসী। কেন্দুয়া-আটপাড়া আসনের সংসদ সদস্য ড. রফিকুল ইসলাম হিলালী বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রতিনিধির জোরালো অবস্থান কেন্দুয়ায় একটি প্রশিক্ষণ গাড়িতেই খুলতে পারে কেন্দুয়ার বিদেশগামী যুবকদের ভাগ্য প্রশিক্ষণ গাড়ি বরাদ্দের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের একাংশ। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা বা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানা যায়নি।
স্থানীয়রা মনে করেন, উপজেলা পর্যায়ে শুধু একটি প্রশিক্ষণ গাড়িতেই খুলতে পারে কেন্দুয়ার বিদেশগামী যুবকদের ভাগ্য প্রশিক্ষণ গাড়ি চালু হলেই এলাকার আর্থ-সামাজিক চিত্রে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ১৩টি ইউনিয়নের যুবকেরা নিজ এলাকায় থেকেই সরকারি সনদে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে প্রতি ব্যাচে ২০ থেকে ৩০ জন করে বছরে অন্তত ১০০ থেকে ১২০ জন দক্ষ চালক তৈরি হবে। দক্ষ হয়ে বিদেশে গেলে তাদের বেতন কাঠামোর পাশাপাশি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে। প্রশিক্ষিত চালকের সংখ্যা বাড়লে তা পরোক্ষভাবে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতেও দারুণ ভূমিকা রাখবে। সরকারি এই প্রকল্পে নারীদেরও অংশগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে। ফলে গ্রামীণ নারীদের জন্যও এটি আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নতুন দরজা খুলে দিতে পারে।
বিশাল কোনো অবকাঠামো বা আয়োজনের হয়তো এখনই প্রয়োজন নেই। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, উপজেলা পরিষদ চত্বর বা যেকোনো অস্থায়ী মাঠ ব্যবহার করেই প্রাথমিকভাবে এই কার্যক্রমটি শুরু করা সম্ভব। এখন প্রয়োজন কেবল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একটু সদিচ্ছা। একটিমাত্র প্রশিক্ষণ গাড়ি বরাদ্দ পেলেই কেন্দুয়ার হাজারো তরুণের প্রবাস জীবনের পথ আরও মসৃণ ও নিরাপদ হবে। স্বপ্নবাজ যুবকেরা এখন সেই সুদিনেরই অপেক্ষায়।
পড়ুন : আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন তাওহীদ একাদশ


