বয়স ৪১ বছর। কিন্তু মাঠে লুকা মদরিচকে দেখে বয়সের ছাপ বোঝার উপায় যেন নেই। সময় যত গড়াচ্ছে, ক্রোয়েশিয়ার এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ততই নতুন নতুন কীর্তি গড়ে চলেছেন। এবার উয়েফা নেশনস লিগে চেকিয়ার বিপক্ষে গোল করে নিজের গড়া সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ডই নতুন করে লিখেছেন মদরিচ।
চেকিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে ৪৭ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দারুণ শটে বল জালে জড়িয়ে দেন মদরিচ। তার সেই গোলেই আবারও ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লিখিয়েছেন তিনি। গোল করার সময় মদরিচের বয়স ছিল ৪১ বছর ১৭ দিন। এর মাধ্যমে ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করার রেকর্ড নিজের দখলেই আরও শক্ত করেছেন এই তারকা।
মদরিচের জন্য জাতীয় দলের জার্সিতে এমন রেকর্ড অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুনে প্রথমবার ক্রোয়েশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। ইউরো ২০২৪-এ ইতালির বিপক্ষে গোল করার সময় তার বয়স ছিল ৩৮ বছর ২৮৯ দিন। ওই গোলের মাধ্যমে শুধু দেশের রেকর্ডই নয়, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসেও সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার কীর্তি গড়েছিলেন তিনি।
ইতালির বিপক্ষে সেই ম্যাচটি মদরিচের ক্যারিয়ারে বিশেষ হয়ে আছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় দলের হয়ে তার ভূমিকা বদলালেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন তিনি। চেকিয়ার বিপক্ষে সর্বশেষ গোলটিও তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতার আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
মদরিচের আগে ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দলের সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতার রেকর্ড ছিল নিকো কোভাচের দখলে। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে কাজাখস্তানের বিপক্ষে গোল করেছিলেন কোভাচ। তখন তার বয়স ছিল ৩৬ বছর ১০ মাস ২২ দিন। দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা হিসেবে তার নাম ছিল রেকর্ডের পাতায়।
তবে সময়ের সঙ্গে সেই রেকর্ড বদলে যায়। মদরিচের পর ক্রোয়েশিয়ার হয়ে বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বয়সে গোল করা খেলোয়াড়দের তালিকায় জায়গা করে নেন ইভান পেরিশিচ। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে গোল করে ৩৭ বছর ৫ মাস ১ দিন বয়সে কোভাচকে ছাড়িয়ে যান পেরিশিচ। কিন্তু মদরিচের রেকর্ড থেকে তিনি তখনও অনেক দূরে ছিলেন।
চেকিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মদরিচের গোলের পর আবারও সামনে এসেছে তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের স্থায়িত্ব। ৪১ বছর বয়সেও জাতীয় দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করার সক্ষমতা ধরে রেখেছেন তিনি। শুধু গোল করাই নয়, দলের মাঝমাঠেও তার অভিজ্ঞতা এখনো ক্রোয়েশিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
মদরিচের রেকর্ডের দিন অবশ্য ম্যাচটিও নিজেদের করে নিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। চেকিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে ক্রোয়াটরা। ম্যাচে প্রথমে গোল করে ক্রোয়েশিয়াকে এগিয়ে দেন মদরিচ। এরপর চেকিয়া সমতায় ফেরে আদাম কারাবেকের গোলে। ম্যাচের শেষ দিকে মার্কো পাশালিচের গোল ক্রোয়েশিয়াকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত জয়।
ম্যাচের আগে অবশ্য মদরিচকে নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। জ্বরে ভুগছিলেন তিনি। এ কারণে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও উপস্থিত হতে পারেননি এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। এমন পরিস্থিতিতে তার মাঠে নামা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে দলের হয়ে মাঠে নামেন তিনি এবং গোল করে নিজের উপস্থিতির গুরুত্বও জানান দেন।
মদরিচের ক্যারিয়ারে বয়স যেন এখন আর কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। ৩৮ বছর বয়সে ইউরোতে রেকর্ড গড়া থেকে শুরু করে ৪১ বছর বয়সে আবারও জাতীয় দলের হয়ে নতুন রেকর্ড—প্রতিটি অর্জনই তার দীর্ঘ ফুটবলজীবনের ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
ক্রোয়েশিয়ার হয়ে মদরিচের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারও বেশ দীর্ঘ। বছরের পর বছর জাতীয় দলের মাঝমাঠে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বড় টুর্নামেন্টে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। তার অভিজ্ঞতা দলের তরুণ ফুটবলারদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বয়স বাড়লেও জাতীয় দলে তার উপস্থিতি এখনো ক্রোয়েশিয়ার জন্য বড় সম্পদ।
চেকিয়ার বিপক্ষে জয় পাওয়ার পর অবশ্য বিশ্রামের খুব বেশি সুযোগ পাচ্ছে না ক্রোয়েশিয়া। নেশনস লিগের পরবর্তী ম্যাচেই কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে হবে তাদের। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর সেভিয়ায় স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামবে ক্রোয়েশিয়া। এরপর গ্রুপ এ৩-তে ইংল্যান্ড ও স্পেনের বিপক্ষেও আরও ম্যাচ রয়েছে।
স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচে মদরিচ মাঠে থাকবেন কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা না গেলেও চেকিয়ার বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ক্রোয়েশিয়ার জন্য ইতিবাচক বার্তা। ৪১ বছর বয়সে গোল করে শুধু একটি ম্যাচে দলকে এগিয়ে দেননি, নিজের গড়া রেকর্ডও আরও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি।
ফুটবলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষের দিকে এগোয়। কিন্তু মদরিচ যেন সেই প্রচলিত ধারণাকে বারবার চ্যালেঞ্জ করছেন। ৪১ বছর ১৭ দিন বয়সে ক্রোয়েশিয়ার হয়ে গোল করে তিনি আবারও প্রমাণ করলেন, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা থাকলে বয়সের সীমারেখাও নতুনভাবে লেখা সম্ভব।
চেকিয়ার বিপক্ষে ক্রোয়েশিয়ার ২-১ ব্যবধানের জয় তাই শুধু তিন পয়েন্টের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ম্যাচটি হয়ে থাকল মদরিচের আরেকটি রেকর্ডের সাক্ষী। নিজের গড়া রেকর্ড নিজেই ভেঙে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এই কীর্তি তার দীর্ঘ ও বর্ণিল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকল।
পড়ুন:পেনাল্টি মিসের মাশুল ইংল্যান্ডের, ওয়েম্বলিতে স্পেনের জয়
ইমি/


