মানুষের মতো দেখতে এবং মানুষের মতো বিভিন্ন কাজ করতে সক্ষম রোবট তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে টেসলা। প্রতিষ্ঠানটির বহুল আলোচিত হিউম্যানয়েড রোবট ‘অপটিমাস’কে ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে বিবেচনা করছেন প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তবে বড় পরিসরে এই রোবটের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
দ্য ইনফরমেশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে অপটিমাস রোবটের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে টেসলা। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে যেখানে সপ্তাহে কয়েক ডজন রোবট তৈরি হচ্ছিল, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে কয়েক শতে পৌঁছেছে। তবে উৎপাদন আরও বাড়িয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো এখনো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রোবটটির জটিল কাঠামো এবং মানুষের মতো হাত তৈরি ও সংযোজনের প্রক্রিয়া উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
টেসলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরের শেষ নাগাদ প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার অপটিমাস রোবট উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে সপ্তাহে ২০ হাজার রোবট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। কিন্তু বর্তমান উৎপাদন ব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে এত বড় পরিসরে উৎপাদন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
অপটিমাস তৈরির ক্ষেত্রে একাধিক সরবরাহকারী ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন যন্ত্রের ওপর নির্ভর করছে টেসলা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহকারীদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে কারখানায় ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং বিভিন্ন ধাপে সমন্বয়ের সমস্যাও উৎপাদনের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো রোবটের হাত তৈরি ও সংযোজন। মানুষের হাতের মতো দেখতে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম কাজ করার উপযোগী হাত তৈরি করা প্রযুক্তিগতভাবে বেশ কঠিন। অপটিমাসের হাতেও একাধিক জটিল যান্ত্রিক উপাদান রয়েছে। এগুলো নির্ভরযোগ্যভাবে তৈরি করে দ্রুত উৎপাদন লাইনে সংযোজন করা টেসলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে অপটিমাসের তৃতীয় সংস্করণ তৈরি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রিমন্ট কারখানায়। আগের সংস্করণগুলোর তুলনায় নতুন সংস্করণে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর কাঠামো আগের তুলনায় হালকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যামেরা ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে এবং রোবটটির নকশাকে আরও মানবসদৃশ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অপটিমাসের কার্যক্ষমতার পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোবটটির এআই ব্যবস্থা পাঁচ লাখ ঘণ্টার বেশি বাস্তব পরিবেশের তথ্য ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাস্তব পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের কাজ বোঝা ও সম্পাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে টেসলা।
তবে এত উন্নতির পরও অপটিমাস এখনো সাধারণ উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম হয়নি। বর্তমানে নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য প্রোগ্রাম করা অবস্থায় এবং মানুষের তত্ত্বাবধানে রোবটটি ব্যবহার করা হচ্ছে। টেসলার নিজস্ব কারখানা ও পরীক্ষামূলক এলাকায় এর কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাস্তব পরিবেশে রোবটটির সক্ষমতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করাই এই পরীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য।
অপটিমাসের বর্তমান সংস্করণকে এখনো চূড়ান্ত ভোক্তা সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করছে না টেসলা। রোবটটির স্থায়িত্ব, যান্ত্রিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার ক্ষমতায় আরও উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে শুরুতেই সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সরাসরি বিক্রি করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে রোবট ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব গুদাম বা শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ রয়েছে, সেসব জায়গাকে বেছে নেওয়া হতে পারে। টেসলার নিজস্ব কারখানার মতো পরিবেশে রোবট পরিচালনা করলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনে রোবট ফিরিয়ে এনে এর যান্ত্রিক কাঠামো বা সফটওয়্যারে পরিবর্তন করার সুযোগও থাকবে।
এ ধরনের বাস্তব ব্যবহারের মাধ্যমে টেসলা আরও একটি সুবিধা পেতে পারে। রোবটগুলো বাস্তব কর্মপরিবেশে কাজ করার সময় যে তথ্য সংগ্রহ করবে, তা ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে রোবট ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনাটি শুধু ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ নয়, প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বাস্তব তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অপটিমাস নিয়ে টেসলার উচ্চাকাঙ্ক্ষা অবশ্য এর চেয়েও বড়। ইলন মাস্ক একাধিকবার হিউম্যানয়েড রোবটকে টেসলার ভবিষ্যৎ ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অপটিমাসের বাণিজ্যিক বিক্রি শুরু হতে পারে।
তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে টেসলাকে উৎপাদনসংক্রান্ত বেশ কিছু সমস্যা সমাধান করতে হবে। সপ্তাহে কয়েক ডজন থেকে কয়েক শ রোবট উৎপাদনে পৌঁছানো সম্ভব হলেও হাজার বা তারও বেশি সংখ্যায় নিয়মিত উৎপাদনের জন্য পুরো সরবরাহব্যবস্থা ও উৎপাদন প্রক্রিয়াকে আরও স্থিতিশীল করতে হবে। বিশেষ করে রোবটের হাতের মতো জটিল অংশ বড় পরিসরে একই মান বজায় রেখে উৎপাদন করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া রোবটের যান্ত্রিক নির্ভরযোগ্যতা, সফটওয়্যার সক্ষমতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব পরিবেশে নিরাপদে কাজ করার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি হিউম্যানয়েড রোবটকে ব্যাপকভাবে বাজারজাত করতে শুধু দেখতে মানুষের মতো হলেই হবে না; তাকে নির্দিষ্ট কাজ নির্ভুলভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং নিরাপদে সম্পন্ন করার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
অপটিমাসের উৎপাদন বাড়াতে টেসলার বর্তমান প্রচেষ্টা তাই শুধু একটি নতুন পণ্য বাজারে আনার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রোবটের নকশা, যান্ত্রিক প্রকৌশল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যাপক উৎপাদন সক্ষমতা। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিক উন্নতি করতে পারলেই টেসলার নির্ধারিত উৎপাদন ও বাণিজ্যিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, অপটিমাস নিয়ে টেসলা দ্রুত এগোলেও বড় পরিসরে উৎপাদন এখনো সহজ হয়নি। উৎপাদন বাড়ানোর পথে সরবরাহকারীদের সীমাবদ্ধতা, স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির ত্রুটি এবং বিশেষ করে মানুষের মতো জটিল হাত তৈরি ও সংযোজন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। আগামী সময়ে এসব সমস্যা কতটা কার্যকরভাবে সমাধান করা যায়, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে অপটিমাসের ব্যাপক উৎপাদন ও বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের গতি।
পড়ুন:পেনাল্টি মিসের মাশুল ইংল্যান্ডের, ওয়েম্বলিতে স্পেনের জয়
ইমি/


