পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশজুড়ে সন্ত্রাসবিরোধী ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। গত ৯৬ ঘণ্টায় পরিচালিত এসব অভিযানে ভারত ও আফগানিস্তানের ‘মদতপুষ্ট’ ৭১ সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরকও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, এক বিবৃতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে ইসলামাবাদের এ অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কাবুল ও নয়াদিল্লির কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে আফগানিস্তান জানিয়েছে, পাকিস্তান থেকে কথিত দায়েশ সদস্যরা সীমান্ত পেরিয়ে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় নুরিস্তান প্রদেশে প্রবেশের পর তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। ওই অভিযানে ২৮ জন সন্ত্রাসী নিহত এবং আরও ৩২ জন আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে আফগান বাহিনী। তবে আফগানিস্তানের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এটিকে ‘হাস্যকর, ভিত্তিহীন ও সম্পূর্ণ অসত্য’ বলে মন্তব্য করেছে।
পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নুরিস্তান বা আফগানিস্তানের অন্য কোথাও অভ্যন্তরীণ সংঘাতে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জড়িত থাকার দাবি পাকিস্তান দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। সাবেক আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ বা প্রশিক্ষণ দেয়া কিংবা আফগানিস্তানে সক্রিয় দায়েশ বা অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সহায়তা করার অভিযোগও সম্পূর্ণ বানোয়াট।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার জন্য ভারত ও আফগানিস্তান সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে বলে অভিযোগ করে আসছে পাকিস্তান। তবে ভারত ও আফগানিস্তান এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী তালেবান সরকারকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। টিটিপি বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার দেশটির ভূখণ্ড ব্যবহার করে টিটিপির সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। তবে কাবুল এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় না বলেও জানিয়ে আসছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহারের পর এবং তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলা বেড়েছে। এসব হামলার বড় অংশই টিটিপি চালিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোহাটে একটি পুলিশ সদর দপ্তরে বিস্ফোরণ ও বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৩১ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ১৬ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার আফগানিস্তান থেকে উৎক্ষেপণ করা ড্রোন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার পর আফগানিস্তানের ১০টি স্থানে বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় পাকিস্তান। ইসলামাবাদ এসব হামলাকে ‘পরিকল্পিত, নির্ভুল, পরিমিত ও আনুপাতিক’ বলে বর্ণনা করেছে। পাকিস্তানের দাবি, হামলাগুলো শুধু শনাক্ত করা সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং এসব স্থাপনা ড্রোন হামলার চেষ্টার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল।
আফগান তালেবানের প্রতি অবিলম্বে বৈরী তৎপরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ‘কার্যকর, সুনির্দিষ্ট, যাচাইযোগ্য ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইসলামাবাদ।
এর আগে পাকিস্তানের খাইবার-পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। নিরাপত্তা বাহিনীর এ অভিযানে ভারত-সমর্থিত ২২ অস্ত্রধারী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে নিহতদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে দেশটির সামরিক বাহিনী।
সংবাদমাধ্যম দ্য নিউজ জানিয়েছে, উত্তর ওয়াজিরিস্তানের শেওয়া এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, মঙ্গলবার (১৯ মে) দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ১৭ মে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় অস্ত্রধারীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে ‘স্যানিটাইজেশন অপারেশন’ শুরু করা হয়।
আইএসপিআর জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় নিরাপত্তা বাহিনী ‘ভারত-সমর্থিত ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ গোষ্ঠীর ২২ সদস্যকে হত্যা করেছে। অস্ত্রধারীদের অবস্থান শনাক্ত করার পর তীব্র গোলাগুলির মধ্য দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে আইএসপিআর। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দাবি, নিহতরা ওই এলাকায় একাধিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অভিযান এখনো চলছে এবং পুরো এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অভিযানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে দেখা গেছে, সশস্ত্র ব্যক্তিরা স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের চলাচলের জন্য নিরাপদ পথ তৈরি করত। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে মানবঢাল হিসেবেও ব্যবহার করত বলে দাবি করেছে সেনাবাহিনী।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে ‘অত্যন্ত নিন্দনীয়’ উল্লেখ করে আইএসপিআর বলেছে, জনজীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। এলাকায় লুকিয়ে থাকা ‘খাওয়ারিজদের’ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে বলেও জানিয়েছে সেনাবাহিনী।
একই সঙ্গে ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’ পরিকল্পনার আওতায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে পাকিস্তান। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় কর্মপরিকল্পনার ফেডারেল এপেক্স কমিটির অনুমোদিত এ অভিযানের মাধ্যমে বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কাজ করবে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী খাইবার-পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা বেড়েছে। ইসলামাবাদ একাধিকবার কাবুলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, যাতে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে হামলা চালানোর সুযোগ কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী না পায়।
তবে পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান সরকার পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলায় জড়িত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ‘অপারেশন গাজাব লিল-হক’ শুরু করে।
এর কয়েক মাস আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তে আফগান তালেবানের গুলিবর্ষণকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষের পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। তবে একাধিক দফা আলোচনা হলেও আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তালেবান সরকারের অনীহার কারণে এখনো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ।
পড়ুন : জানুয়ারিতেই সংসদে উঠবে সংবিধান সংশোধন বিল, পাস হলেই গণভোট
সা/


