বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগলের ২৮তম জন্মদিন আজ। এ উপলক্ষে গুগলের হোমপেজে বিশেষ একটি ডুডল প্রকাশ করা হয়েছে। ডুডলটিতে গুগলের শুরুর দিকের একটি নস্টালজিক লোগো তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার দীর্ঘ পথচলাকে স্মরণ করছে গুগল।
গুগলের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার তারিখ ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর। সে সময় ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে ইন্টারনেটে থাকা বিপুল পরিমাণ তথ্যকে আরও কার্যকরভাবে খুঁজে বের করার পদ্ধতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গুগলের ভিত্তি তৈরি হয়।
শুরুতে গুগল ছিল মূলত একটি সার্চ ইঞ্জিন। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবপেজের মধ্যে সম্পর্ক ও গুরুত্ব বিশ্লেষণ করে ব্যবহারকারীদের আরও প্রাসঙ্গিক সার্চ ফলাফল দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন তাদের প্রকল্পটি এগিয়ে নেন। পরবর্তী সময়ে সেই গবেষণাই একটি পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি তৈরি করে।
গুগলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ শুরু হয় ১৯৯৮ সালের আগস্টে। সে সময় সান মাইক্রোসিস্টেমসের সহপ্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি বেকটলশেইম ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনকে এক লাখ মার্কিন ডলারের একটি চেক দেন। চেকটি Google Inc.-এর নামে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রার ভিত্তি আরও শক্ত হয়।
এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি গ্যারেজ থেকে গুগলের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সার্চ ইঞ্জিনটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। সহজ ব্যবহার, দ্রুত ফলাফল এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য খুঁজে দেওয়ার সক্ষমতার কারণে গুগল ধীরে ধীরে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
তবে গুগলের জন্মদিন হিসেবে ৪ সেপ্টেম্বর নয়, ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখটি বেশি পরিচিত।
গুগল কেন ২৭ সেপ্টেম্বরকে জন্মদিন হিসেবে পালন করে, এর নির্দিষ্ট কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে শুরুর দিকে সেপ্টেম্বর মাসের বিভিন্ন দিনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করার নজির রয়েছে।
তবে ২০০৬ সাল থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর তারিখটি ধারাবাহিকভাবে গুগলের জন্মদিন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই তারিখ নির্বাচনের পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গুগলের পক্ষ থেকে সবসময় দেওয়া হয়নি। ধারণা করা হয়, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি সময়ে গুগলের ওয়েব সার্চ ইনডেক্সে বড় ধরনের অগ্রগতির সঙ্গে তারিখটির সম্পর্ক থাকতে পারে।
তারিখটি নিয়ে নানা ব্যাখ্যা থাকলেও গুগলের কাছে জন্মদিন এখন তাদের দীর্ঘ প্রযুক্তিগত যাত্রাকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। প্রতিবছর বিশেষ ডুডলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি তার ইতিহাস, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন মাইলফলক তুলে ধরে।
প্রতিষ্ঠার সময় গুগলের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করা। সময়ের সঙ্গে সেই লক্ষ্য আরও বিস্তৃত হয়। সার্চ ইঞ্জিনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক নতুন পণ্য ও সেবা চালু করে।
বর্তমানে Gmail, YouTube, Google Maps, Android, Google Drive এবং Google Photos-এর মতো বহুল ব্যবহৃত সেবা গুগলের প্রযুক্তি পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্মার্টফোনের বাজারেও Pixel সিরিজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
গুগলের বিভিন্ন সেবা এখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করেন। তথ্য খোঁজা থেকে শুরু করে ই-মেইল, ভিডিও দেখা, মানচিত্র ব্যবহার, অনলাইন ফাইল সংরক্ষণ কিংবা স্মার্টফোন পরিচালনা—দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজে গুগলের পণ্য ও সেবা যুক্ত হয়ে গেছে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি গুগলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রতিষ্ঠানটি Gemini প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এআইভিত্তিক বিভিন্ন সেবা ও প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে।
সার্চ প্রযুক্তির পাশাপাশি এআইকে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার সঙ্গে যুক্ত করার দিকেও গুগল গুরুত্ব দিচ্ছে। এর ফলে গুগলের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আরও বাড়ছে।
বর্তমানে গুগল এর মূল কোম্পানি Alphabet Inc.-এর অধীনে পরিচালিত হয়। ২০১৫ সালে Alphabet প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গুগলের বিভিন্ন ব্যবসা ও প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়।
Alphabet-এর অধীনে গুগলের মূল সার্চ ব্যবসার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন, ক্লাউড কম্পিউটিং, হার্ডওয়্যার, এআই এবং অন্যান্য প্রযুক্তি কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
গুগলের ২৮তম জন্মদিনের ডুডল মূলত প্রতিষ্ঠানটির শুরুর দিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কয়েকজন গবেষকের একটি ছোট প্রকল্প থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার গল্পই এবারের ডুডলের মূল ভাবনায় উঠে এসেছে।
১৯৯৮ সালে যাত্রা শুরুর সময় ইন্টারনেটের তথ্য খোঁজার সমস্যার সমাধান ছিল গুগলের প্রধান লক্ষ্য। ২৮ বছর পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম এখন সার্চ ইঞ্জিনের গণ্ডি পেরিয়ে ই-মেইল, ভিডিও, মানচিত্র, মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম, হার্ডওয়্যার, ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ প্রযুক্তির নানা ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
বিশেষ ডুডলের মাধ্যমে তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়, বরং গুগলের প্রযুক্তিগত বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাসও স্মরণ করা হচ্ছে। একটি সার্চ ইঞ্জিন থেকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার এই যাত্রাই গুগলের ২৮তম জন্মদিনের ডুডলের মূল বার্তা।
পড়ুন:অপটিমাস রোবটের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে বড় বাধায় টেসলা
ইমি/


