ঢাকার আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে ২৫ মামলার আসামি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, আসামি পালানোর ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এছাড়া ডিসি হেডকোয়ার্টারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি করা হয়েছে।
কারাগার সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতে হাজিরার জন্য রোববার সকালে প্রিজন ভ্যানে করে পিচ্চি রাজাকে ঢাকায় নেওয়া হয়। আদালতে হাজিরা শেষে তাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ফিরিয়ে নেওয়ার সময় প্রিজন ভ্যানটি গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছায়। তখন শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলেন পিচ্চি রাজা।
পরে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য তাকে একটি শৌচাগারে নিয়ে যান। সেখানে সুযোগ পেয়ে কৌশলে পালিয়ে যায় সে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহাম্মদপুর থানার একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৯ মে মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রাজা ওরফে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পিচ্চি রাজা, তার স্ত্রী ও শ্যালক নেপাল থেকে দেশে ফেরার খবরে পুলিশ বিমানবন্দরে অবস্থান নেয়। পরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় তাদের হেফাজতে নেওয়া হয়।
কারাগার থেকে এখনো পলাতক ৫২ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি
কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৯৯ আসামির মধ্যে ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেও এখনো ৫২ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। কারাবিধি অনুযায়ী কনডেম সেলে থাকার কথা থাকলেও এসব আসামির অনেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে মুক্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাদের কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে ধারণা করা হলেও সংশ্লিষ্টদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থির সময়ে দেশের অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে বিভিন্ন কারাগার থেকে মোট ২ হাজার ২৪৭ জন বন্দি পালিয়ে যান। এর মধ্যে ৬৯০ জন এখনো পলাতক।
কাশিমপুর থেকে পালিয়েছিলেন ৮৮ ফাঁসির আসামি
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ২০২ জন বন্দি পালিয়ে যান। তাদের মধ্যে ৮৮ জন ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের ছোট কাজরা গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (৩০) তাদের একজন। গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারে দাঙ্গা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সুযোগে অন্য বন্দিদের সঙ্গে দেয়াল টপকে পালিয়ে যান তিনি। রাজধানীর মতিঝিলের একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোয়াজ্জেম প্রায় দুই বছর পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ফেরত গেছেন।
একই কারাগার থেকে পালিয়েছিলেন গোপালগঞ্জের আব্দুল্লাহ শিকদার। সুদের টাকা আদায়কে কেন্দ্র করে প্রতিবেশীকে হাতুড়িপেটা ও পরে কুপিয়ে হত্যার দায়ে আব্দুল্লাহ ও তার তিন সহযোগীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে তাকে হাই সিকিউরিটি কারাগারে রাখা হয়েছিল। তাকেও পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিচয় বদলে আত্মগোপনে পলাতকদের অনেকে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো পলাতক থাকা আসামিদের অনেকে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছেন এবং নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন করছেন। আত্মগোপনে থাকতে নানা কৌশল অবলম্বন করায় তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।
নরসিংদী কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৮২৬ বন্দির মধ্যে ১৬৬ জনের কোনো পরিচয় বা নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। বিভিন্ন কারাগার থেকে পালানো নয়জন জঙ্গির মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনজন এখনো পলাতক।
জঙ্গি সম্পৃক্ত ৯৮ বন্দির ৭০ জনের হদিস নেই
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, কারাগার থেকে পালানো বন্দিদের মধ্যে ৯৮ জন জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে সাজাপ্রাপ্ত নয়জনের চারজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। পরে ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও ৭০ জনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, পলাতকদের মধ্যে জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হিযবুত তাহ্রীরের ৫৯ জন, হুজি-বির ১৬ জন, নব্য জেএমবির ১৬ জন, আল্লাহর দলের নয়জন, জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার একজন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার একজন সদস্য রয়েছেন।
এ ছাড়া ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্ত হওয়া ৩৮০ জনও আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন না। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জামিনে বের হওয়া ও জেল পলাতক কয়েকজন জঙ্গির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
কারাগার থেকে লুট ৮৫ অস্ত্র, উদ্ধার হয়নি ২৭
কারা অধিদপ্তর সূত্র আরও জানায়, জুলাই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন কারাগার থেকে ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮ হাজার ১৫ রাউন্ড গুলি লুট হয়। পরে ৫৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হলেও এখনো ২৭টি অস্ত্র ও ৬ হাজার ৩৫২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে ফেরানোর বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। বড় অপরাধীরা গোপনে থাকার চেষ্টা করবে। অনেকে পালানোর পর দেশ ছেড়েছে বলে ধারণা করা হয়, আবার কেউ আত্মগোপনে থেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দিতে পারে।
তিনি বলেন, এসব বন্দি যত দিন বাইরে থাকবে, তত দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকবে। সবাইকে ফেরানো না গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে কারাগার থেকে বন্দি পালানোর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকবে।
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রেপ্তারের তাগিদ
সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, কারাগার থেকে পালানোর পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেককে গ্রেপ্তার করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে অন্যান্য দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় অনেক বন্দি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকা উচিত। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
কারা অধিদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল বলেন, বন্দি পালানোর ঘটনার পরই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে কারা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য দেওয়া হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্দিরা পালানোর পর থেকেই অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটকে বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এটিইউ শুরু থেকেই বন্দিদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে এবং অনেককে গ্রেপ্তারও করেছে। অন্যান্য সংস্থাও তাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। এখনো যারা অধরা, তাদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য, পলাতক দুর্ধর্ষ বন্দিরা বারবার অবস্থান পরিবর্তন করায় সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে না।
পড়ুন : লাগামহীন এলপিজির বাজার, ভোক্তার ঘাড়ে বাড়তি বোঝা
সা/


