ইরানকে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার পাশাপাশি দেশটির জব্দ করা অর্থে প্রবেশাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে—এমন খবরকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি প্রতিবেদনটিকে ‘হোক্স’ বলে উল্লেখ করেন।
তবে এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও এক দফা পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। মঙ্গলবারের মধ্যে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার আশা করছে তেহরান।
আরাগচি বলেন, আলোচনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মঙ্গলবার পাওয়া যেতে পারে-‘আশা করা যায়’।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই এই আলোচনা ও ট্রাম্পের মন্তব্য সামনে এসেছে। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা জব্দ করা অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো স্পষ্টভাবে এক নয়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত নিশ্চিত করেছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সপ্তাহান্তে উপসাগরীয় দেশটি সফরের সময় প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনা এবং নেতানিয়াহুর আমিরাত সফর—দুই ঘটনাই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধ শেষ করার নতুন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন। দুই দেশের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
আলোচনায় ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে কথা হতে পারে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা। এ কারণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শেষ হওয়ার পরও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।
ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে, শত্রুতা বন্ধ করলে এবং জব্দ করা সম্পদ ছাড়লে তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেবে।
আলোচনার বিষয়ে অবহিত এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পরবর্তী যেকোনো আলোচনা গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের বাইরে ইরানের দেওয়া সাত দিনের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে হতে পারে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার পরও নিউইয়র্কে অবস্থান করা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ইরান তাদের সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাব এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে সামুদ্রিক চলাচল পুনরায় চালুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া শর্তগুলোর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া আশা করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা IRNA এ তথ্য জানিয়েছে।
আরাগচি বলেন, ‘আমেরিকানরা যদি দাবি করে যে তারা একটি চুক্তি বা শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়, তাহলে আমরা সেই সমাধানই উপস্থাপন করেছি।’
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও পৃথকভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
আরও আলোচনার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
ইরানের সাত দিনের পরিকল্পনায় ইরান ও লেবাননে সব ধরনের শত্রুতা বন্ধ করা, কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা রয়েছে।
এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার অনুমতি দেবে ইরান। একই সঙ্গে দুই পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করবে। ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দখল বা ধ্বংস করার বিষয়টিও চান।
শনিবার ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যে কঠিন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে, সে কারণেই তারা দ্রুত একটি চুক্তি করতে চাইছে।
তবে রোববার এক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন মার্কিন আলোচকরা এ সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনায় বসবেন।
রোববার আরাগচি বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি ইরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। তাই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ইরান ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে।
আরাগচি বলেন, ‘আমাদের শর্তগুলো পরিষ্কার, এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার যেকোনো পদক্ষেপ এই শর্তগুলো পূরণের ওপর নির্ভরশীল।’
তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানই এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে।
আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ বিষয়
১. যুদ্ধ থামাতে আবার আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি নয়, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলাদাভাবে আলোচনা করছে। লক্ষ্য হলো চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে নতুন যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় পৌঁছানো।
২. ইরানের প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে আলোচনা
ইরান গত সপ্তাহে সাত দিনের একটি যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা দিয়েছিল। সেই প্রস্তাবের সংশোধিত সংস্করণ নিয়ে পরবর্তী আলোচনা হতে পারে।
ইরানের প্রস্তাবে রয়েছে—
ইরান ও লেবাননে যুদ্ধ বা শত্রুতা বন্ধ
ইরানের জব্দ করা অর্থ ও সম্পদ ছাড়
ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া
ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার
৩. বিনিময়ে হরমুজ প্রণালী খুলতে চায় ইরান
ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ করবে, অবরোধ তুলে নেবে এবং সম্পদ অবমুক্ত করবে। এরপর হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা হবে।
৪. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা
হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনা করতে রাজি বলে জানিয়েছে ইরান।
অন্যদিকে, ট্রাম্প ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছেন। ফলে সম্ভাব্য সমঝোতার ক্ষেত্রে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৫. এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি
আলোচনা শুরু হলেও যুদ্ধ শেষ করার কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। বর্তমানে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরান কী ছাড় দেবে, যুক্তরাষ্ট্র কী নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ তুলে নেবে, হরমুজ প্রণালী কখন খুলবে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কী ধরনের সমঝোতা হবে।
ইরানের অবস্থান হলো, ‘চাপ ও অবরোধ বন্ধ করুন, আমরা হরমুজ খুলব এবং পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনা করব।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো এসব শর্ত নিয়ে আলোচনা করছে। ফলে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকলেও যুদ্ধ শেষ করার চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো হয়নি।
সূত্র: রয়টার্স
পড়ুন : অক্টোবরে শুরু হচ্ছে রূপপুরের দ্বিতীয় ইউনিটের ইউরেনিয়াম সরবরাহ: রোসাটমের বিবৃতি
সা/


