বাংলাদেশের রপ্তানি আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণ—দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন বাণিজ্য সচিব।
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে পণ্য ও বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৮টি প্রধান বাণিজ্য গন্তব্যের জন্য পৃথক রপ্তানি কৌশল প্রণয়ন করছে সরকার। প্রতিটি বাজারের সম্ভাবনা, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা, প্রতিযোগী দেশ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চিহ্নিত করে এসব কৌশল তৈরি করা হচ্ছে।
সোমবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান।
এ সময় রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলতে পণ্য ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান বাণিজ্য সচিব । নির্দিষ্ট ১৮টি রপ্তানি গন্তব্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা প্রোফাইল এবং কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বাজারের জন্য সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করা হবে। একই সঙ্গে ওই বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি অবস্থান, প্রধান প্রতিযোগী দেশ এবং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হবে। এসব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের রূপরেখাও তৈরি করা হবে।
১৮টি প্রধান বাজারের মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জাপান, কানাডা, বেলজিয়াম এবং অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড-ফিজি অঞ্চল। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ফিজিকে একটি একক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ তিনটি দেশই ওশেনিয়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিটি বাজারের পরিস্থিতি, রপ্তানি বাধা এবং সম্ভাবনাময় পণ্যসংক্রান্ত তথ্য একত্রিত করে আলাদা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে কোন বাজারে কোন পণ্যের সম্ভাবনা বেশি, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী কারা এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
এ জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৮টি বাজার বিশ্লেষণে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ম্যাট্রিক্স’ বা ছক ব্যবহার করছে। এতে সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির হিস্যা, নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিযোগী, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধির উপায় এবং বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাণিজ্য সচিব বলেন, এই ১৮টি প্রধান বাজারের বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনাময় পণ্য শনাক্ত করা, বিদ্যমান পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে রপ্তানি খাতের জন্য আরও বাস্তবভিত্তিক ও বাজারকেন্দ্রিক পরিকল্পনা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কর্মশালায় রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে শুধু পণ্যের ওপর নির্ভর না করে সেবা খাতকেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণে পণ্যের পাশাপাশি সেবার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতি, সক্ষমতা-বর্ধনকারী সেবা এবং ফ্রিল্যান্সারদের জন্য আরও সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার উন্নয়ন জরুরি। এ জন্য উৎপাদন ও সেবা—উভয় খাতেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
পাশাপাশি ভৌগোলিক নৈকট্য ও বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর জন্য আরও জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে নীতি সহায়তা, অবকাঠামো এবং ব্যবসায়িক সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠে আসে।
কর্মশালায় তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ, সিপিডি, ওয়ালটন গ্রুপ, বাংলাদেশ এগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন এবং ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ অংশ নেয়। তাঁরা বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন।
আলোচনায় তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং অন্যান্য সেবা খাতকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এসব খাতে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বড় পরিসরে প্রবেশ করতে হলে বাজার প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি, দক্ষতা, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং নীতি সহায়তার ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা অল্প কয়েকটি বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নতুন বাজারে নতুন পণ্য নিয়ে প্রবেশ এবং বিদ্যমান বাজারে পণ্যের পরিধি বাড়ানোর মাধ্যমে রপ্তানির ভিত্তি আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের প্রস্তাবিত ১৮ বাজারভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়িত হলে কোন বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা ও সম্ভাবনা রয়েছে, তা আরও সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা ও রপ্তানিকারকদের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার ক্ষেত্রও নির্ধারণ করা যাবে।
সব মিলিয়ে পণ্য ও বাজার—দুই দিকেই বৈচিত্র্য আনার মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও বহুমুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ১৮টি প্রধান বাণিজ্য গন্তব্যকে কেন্দ্র করে পৃথক কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন পণ্য, নতুন বাজার এবং সেবা খাতে রপ্তানির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
পড়ুন:এলপিজির সংকট নেই দাবি আমদানিকারকদের, বাজারে ৫১৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি
ইমি/


