উচ্চ মাত্রার খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন ও নানা কাঠামোগত সমস্যায় দেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি এবার নতুন করে বড় ধরনের সংস্কার প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। প্রায় ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে ঋণ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ)। বিশ্বব্যাংকের অনুমোদিত ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২ বা এফএসএসপি-২-এর অর্থায়ন ৪৫০ মিলিয়ন ডলার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ চলতি সেপ্টেম্বর থেকেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে এবং ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দেবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ২১২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ ধরনের সংস্কার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ৭ দশমিক ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতিও চাপে রয়েছে।
প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে। কমিশনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের সংস্কার, দুর্বল ব্যাংকের রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের প্রস্তাব বা ডিপিপি অনুযায়ী, দুটি প্রধান কম্পোনেন্টের মাধ্যমে এফএসএসপি-২ বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম কম্পোনেন্টে ব্যাংকিং খাতের তদারকি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তদারকি পদ্ধতির উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ অংশে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোতে বিনিয়োগ, সংশ্লিষ্ট জনবলের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শক সেবা নেওয়ার বিষয় রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো আধুনিকায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইসিটি অবকাঠামো উন্নত করার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আর্থিক খাতের তথ্য ও বিশ্লেষণ ব্যবস্থার ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও তথ্যনির্ভর তদারকি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
দ্বিতীয় কম্পোনেন্টে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকিং পুনর্গঠন কার্যক্রমে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এর মধ্যে আর্থিক খাতের সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার, ব্যাংক রেজল্যুশন ও পুনর্গঠন কৌশল তৈরি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সংস্কার কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ব্যাংক পুনর্গঠনের কৌশল তৈরি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কারের ভিত্তি তৈরির কথা জানিয়েছে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সাইবার হামলা এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আর্থিক নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। পুরোনো আইসিটি অবকাঠামো এবং সমন্বিত তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে এসব ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে আমানতকারীদের আস্থা এবং সামগ্রিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে এসব কাঠামোগত সমস্যা মোকাবিলার পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রকল্পটি ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা, ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
এর আগে ব্যাংক খাতের সংস্কারে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-১ বা এফএসএসপি-১ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ওই প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। নতুন প্রকল্প গ্রহণের সময় আগের প্রকল্পে তৈরি হওয়া যন্ত্রপাতি, পণ্যসামগ্রী ও অবকাঠামো যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এফএসএসপি-১-এর আওতায় তৈরি করা ডেটা সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি বর্তমানে চালু রয়েছে। একই সঙ্গে আগের প্রকল্পের কিছু যন্ত্রপাতি ও পণ্যসামগ্রী ইতোমধ্যে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে সেগুলো নতুন প্রকল্পে হস্তান্তর বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের সময় পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়ন পাওয়ার বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সম্মতিপত্র এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ দেওয়ার নিশ্চয়তাপত্র টিএপিপিতে সংযুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কাগজপত্র সংযুক্ত করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব পরামর্শ অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, দুর্বল সুশাসন এবং তদারকি সক্ষমতার মতো বিষয়গুলো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্যও ব্যাংক খাতের ওপর চাপের চিত্র তুলে ধরেছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া এ প্রকল্পের মাধ্যমে তদারকি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন, আমানত সুরক্ষা, ব্যাংক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আর্থিক খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হবে।
পড়ুন:১৮ দেশের বাজার ঘিরে রপ্তানি কৌশল প্রস্তুত: বাণিজ্য সচিব
ইমি/


