বাংলাদেশকে সুসংবাদ দিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যদিকে এলএনজি নিয়ে দুঃসংবাদ দিল কাতার। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের বিশেষায়িত কিছু ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানে শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা মিলেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে কাতার।
অর্থাৎ বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির হলেও জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে কাতারের সিদ্ধান্ত নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশেষায়িত ওষুধে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ছাড়
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষায়িত কিছু ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর কোনো অ্যাড ভ্যালোরেম শুল্ক আরোপ করবে না যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশসহ মোট ২০টি দেশকে নির্দিষ্ট এসব পণ্যে শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে দেশগুলোর তালিকা ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করেছে। এর আগে নির্দিষ্ট কিছু পেটেন্টযুক্ত ওষুধ ও সংশ্লিষ্ট উপাদানের আমদানিতে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ তালিকাভুক্ত দেশগুলো শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা পাবে।
এই ছাড়ের আওতায় রয়েছে বিরল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার ওষুধ, কোষভিত্তিক চিকিৎসা, জিন থেরাপি, অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেটস (এডিসি) এবং পশু চিকিৎসার ওষুধ। এসব ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত সংশ্লিষ্ট উপাদানও শূন্য শুল্কের আওতায় থাকবে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি তালিকায় রয়েছে ভারত, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, গুয়াতেমালা, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, জর্ডান, মালয়েশিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনাম।
মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নোটিশ অনুযায়ী, এসব দেশ ও অঞ্চল থেকে আসা যোগ্য পণ্য শূন্য শতাংশ শুল্কের সুবিধা পাবে। এসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বা আসন্ন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা কাঠামোসংক্রান্ত চুক্তি রয়েছে।
গত ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পেটেন্টযুক্ত ওষুধ, বায়োলজিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট উপাদানের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ওষুধ উৎপাদন বাড়ানোই ছিল ওই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য।
তবে জেনেরিক ওষুধ ও এর সংশ্লিষ্ট উপাদান এই শুল্কের আওতায় পড়বে না বলে জানিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানিতে অতিরিক্ত শুল্কের চাপ থাকছে না।
নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি দেবে না কাতার
অন্যদিকে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এসেছে ভিন্ন ধরনের খবর। হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ এশিয়ার বেশ কয়েকটি ক্রেতা দেশে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে কাতার।
দেশটির রাষ্ট্রীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির নোটিশের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইতালির শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি কোম্পানি এডিসন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সূত্রের বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
এশিয়ার বাণিজ্যিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি আমদানিকারক দেশগুলোকে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত কাতার থেকে এলএনজি না পাওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
এডিসনের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘাতের কারণে প্রথমবার এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কাতারএনার্জি ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ নোটিশ জারি করে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় সেই নোটিশের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
ইতালির প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের আগে তারা কাতার থেকে কোনো এলএনজি কার্গো পাচ্ছে না।
ইরান সংঘাতের সার্বিক প্রভাবে কাতার বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাজার বিশ্লেষণকারী সংস্থা আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের আগস্টে কাতার যেখানে ৫০৯টি এলএনজি কার্গো পাঠাতে পেরেছিল, সেখানে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত তারা মাত্র ১৮টি কার্গো পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্টের শেষ নাগাদ কাতারের এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৯৬ শতাংশ কমে গেছে।
এদিকে ইতালির প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, কাতারএনার্জি তাদের আরও ছয়টি চালান বাতিল করেছে। এতে মোট সরবরাহ না পাওয়া চালানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে। সংকট সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প হিসেবে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভর করছে।
কাতারএনার্জির সঙ্গে এডিসনের ২০০৯ সাল থেকে ২৫ বছর মেয়াদি একটি চুক্তি রয়েছে। এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করে থাকে।
এরই মধ্যে শীত মৌসুম সামনে রেখে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সীমিত মজুত ঘিরে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই একই সময়ে সামনে এসেছে দুই ভিন্ন চিত্র—যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষায়িত ওষুধ রপ্তানিতে শূন্য শুল্কের সুবিধা যেমন স্বস্তি দিচ্ছে, তেমনি কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্থগিতের খবরে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
পড়ুন: রাড্ডার ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: ডা. জাহেদ
আর/


