শিশুর হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেয়া ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
শিশুর হেফাজত নিয়ে গর্ভধারিণী মায়ের করা হেবিয়াস করপাস রিটে জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই এ রায় দেন। ‘রোজিনা আক্তার বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এই রায় দেয়া হয়।
আদালতের ২১ পৃষ্ঠার রায়ের মূল অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক।
রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন ভোলার বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন ও রোজিনা আক্তার দম্পতি। তাদের প্রথম সন্তান জন্মের পরপরই মারা যায়।
এরপর ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সাভারের নারী-শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আরেকটি ছেলে সন্তান বাসমিন আবরাবের জন্ম হয়। দুই দিন পর মা ও শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়।
বাড়ি ফেরার পর অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৭ জুলাই তাকে সাভারের সুপার মেডিকেল হাসপাতাল (প্রা.) লিমিটেডের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। একই দিন উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করা হয়।
তবে আর্থিক অনটন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং লকডাউন পরিস্থিতির কারণে জসিম উদ্দিন তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটিকে ওই হাসপাতালে নিতে পারেননি। পরে ১৯ জুলাই তিনি শিশুটিকে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করেন।
শিশুটি এনআইসিইউ ও লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন থাকার সময় দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংসতা, কারফিউ ও লকডাউন পরিস্থিতি চলছিল। রিটকারীর দাবি, হাসপাতাল ফি বাবদ ৩ হাজার টাকা, অগ্রিম ১০ হাজার টাকা এবং বকেয়া বিল বাবদ ২৩ হাজার ১৩৮ টাকাসহ মোট ৩৬ হাজার ১৩৮ টাকা জমা দেয়ার পর নিরাপত্তার কারণে এবং অর্থের সংস্থান করতে শিশুটির বাবা-মা সাময়িকভাবে হাসপাতাল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২৪ সালের ১০ আগস্ট তারা হাসপাতালে গেলে কর্তৃপক্ষ আনুমানিক ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার বিল দাবি করে। বিষয়টি জানতে পেরে ওই দম্পতি ভোলার গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান এবং পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা করেন। এভাবে কয়েক মাস কেটে যায়।
এরপর ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভোলা থানা থেকে ফোন করা হলে পরদিন ১৬ এপ্রিল তারা থানায় গিয়ে জানতে পারেন, তাদের শিশুর বিষয়ে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। তাদের একটি জিডির কপিও দেয়া হয়।
পরবর্তীতে তারা জানতে পারেন, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন আজিমপুরের ‘ছোটমণি নিবাসে’ হস্তান্তর করা হয়েছে। এরপর ছোটমণি নিবাস থেকে শিশুটিকে নিজেদের জিম্মায় নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক এক দম্পতি ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।
মামলা দায়েরের মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ওই দম্পতি একতরফাভাবে শিশুটির অভিভাবকত্ব, জিম্মা এবং পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য ডিক্রি লাভ করেন। এ সময় চেষ্টা করেও জসিম-রোজিনা দম্পতি শিশুটির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি।
পরবর্তীতে শিশুটিকে বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তার গর্ভধারিণী মা রোজিনা আক্তার হেবিয়াস করপাস আইনে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট শিশুটিকে গর্ভধারিণী মায়ের হাতে তুলে দেয়ার বিষয়ে রুল জারি করেন।
তবে মামলার সব বিবাদী ওই রুলের বিরোধিতা করেন। তাদের দাবি, শিশুটিকে প্রায় দুই মাস ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি রাখা হয়েছিল। প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দেয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটির বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে পরিত্যক্ত ও দুস্থ শিশুদের পরিচর্যা ও সুরক্ষার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করে।
বিবাদীদের বক্তব্য অনুযায়ী, যারা শিশুটিকে নিজেদের জিম্মায় নিতে চেয়েছিলেন, তারা ছিলেন নিঃসন্তান দম্পতি এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক। তারা পারিবারিক আদালতে মামলা করেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপযুক্ত পারিবারিক আদালতের ডিক্রির ভিত্তিতে শিশুটির অভিভাবকত্ব ও জিম্মা লাভ করেন।
রিটের বিবাদীরা আরও দাবি করেন, বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা শিশুটিকে পরিত্যাগ করেছিলেন, যা তাদের আচরণ থেকেই স্পষ্ট। শিশুটি কয়েকদিন হাতিরঝিল থানায় ছিল—এটি জানা সত্ত্বেও রিটকারী তাকে দেখার কোনো চেষ্টা করেননি। এমনকি শিশুর অবস্থান সম্পর্কে তারা কোনো সাধারণ ডায়েরিও করেননি।
তাদের আরও বক্তব্য, বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা হওয়া সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের পর থেকে তারা শিশুটির সঙ্গে দেখা করেননি এবং কোনো জিডিও করেননি। তাদের মতে, এটি শিশুটিকে পরিত্যাগ করার শামিল এবং ব্যক্তিগত আইনের অধীনে জিম্মা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতা হিসেবে গণ্য হয়।
এদিকে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রিটকারীর স্বামী শিশুটিকে সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করেন। প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে অবিলম্বে লাইফ সাপোর্টে রাখে।
তিনি আদালতকে জানান, ভর্তির দিন রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শের জন্য শিশুটির বাবাকে খোঁজ করে। কিন্তু তিনি তখন হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না। পরে ভর্তি ফরমে দেয়া যোগাযোগ নম্বরে ফোন করা হলে শিশুটির বাবা জানান, তার স্ত্রীও অসুস্থ থাকায় তিনি বাইরে রয়েছেন এবং শিগগিরই হাসপাতালে ফিরে আসবেন।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, বারবার ফোন করা হলেও তিনি আর হাসপাতালে ফিরে আসেননি। বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার সন্ধান পেতে ব্যর্থ হয়ে এবং অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ২২ জুলাই রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।
হাসপাতালের বিল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠলে ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের ডেপুটি কেয়ারটেকারের উদ্দেশে লিখিত চিঠির মাধ্যমে শিশুটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
হাসপাতালের আইনজীবী আরও দাবি করেন, বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য চাপ না দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে তার বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতার কাছে ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। তবে তারা শিশুটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান, যা ১৮ সেপ্টেম্বরের চিঠিতেও উল্লেখ রয়েছে।
এসব কারণে রুলটি খারিজের জন্য আদালতের কাছে আবেদন করেন হাসপাতালের আইনজীবী।
মামলার সব বিবাদী তাদের নিজ নিজ বক্তব্য ও হলফনামায় জোর দিয়ে বলেন, শিশুটিকে তার বায়োলজিক্যাল পিতা-মাতা পরিত্যাগ করেছিলেন।
রিটকারী ও বিবাদীদের বক্তব্য এবং উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলেন, পিতা-মাতা শিশুটিকে স্বেচ্ছায় ‘পরিত্যাগ’ করেছিলেন, নাকি রাজনৈতিক সংঘাত ও আর্থিক অনটনের কারণে বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে স্থান ত্যাগ করেছিলেন এটি একটি জটিল ও বিতর্কিত প্রশ্ন।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, দেয়ানি ও সাংবিধানিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, রিট এখতিয়ারে সংক্ষিপ্ত শুনানির মাধ্যমে এ ধরনের বিতর্কিত তথ্যের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট আরও বলেন, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারায় পারিবারিক আদালতের আদেশ বা ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে আপিলের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। যখন কোনো বিশেষায়িত আইন এবং নির্দিষ্ট আপিল ফোরাম বিদ্যমান থাকে, তখন সরাসরি হাইকোর্টের রিট এখতিয়ার প্রয়োগ করা সমীচীন নয়।
সার্বিক আইনি পর্যালোচনা শেষে হাইকোর্ট বিভাগ রিট আবেদনে জারি করা রুল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেন এবং এর আগে দেয়া অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাতিল করেন।
তবে গর্ভধারিণী মায়ের আইনি অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত স্পষ্ট করে দেন যে, রিটকারী তার সন্তানের জিম্মা ও অভিভাবকত্ব পাওয়ার জন্য উপযুক্ত বিচারিক ফোরামে অর্থাৎ আইনসম্মত এখতিয়ারসম্পন্ন দেয়ানি বা পারিবারিক আদালতে আইনি প্রতিকার চাইতে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবেন।
একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।
আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন ও আইনজীবী প্রিন্স আল মাসুদ। বিবাদীদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ফিরোজ ও আইনজীবী কাজী মারুফুল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. গোলাম রহমান ও নূর মোহাম্মদ আজমী। ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. লুৎফর রহমান।
পড়ুন : রাড্ডার ঘটনায় বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা: ডা. জাহেদ
সা/


