চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে ব্যাংক খাত থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪১০ শতাংশ।
তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়লেও একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া আগের ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছে সরকার। ফলে মোট হিসাব করলে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। এতে দুই মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সেই হিসাবে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৯ শতাংশ ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থ জোগাতে ব্যাংকনির্ভরতা বেড়েছে। সরকারের নিয়মিত ব্যয়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন আর্থিক দায় মেটাতে রাজস্বের ঘাটতি থাকলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হয়। চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, দেশের বেসরকারি খাত আগে থেকেই নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় সরকারের ব্যাংকঋণের প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে।
এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে থাকায় ব্যাংকগুলোতে সরকারের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আপাতত বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অর্থের একটি অংশ সরকারকে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সরকারের ঋণের সুদের হার কমে আসায় ব্যাংকগুলোর আয়ে প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ঋণের সুদের হার ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হারের নিচে নেমে এসেছে। এতে ব্যাংকগুলোর সুদভিত্তিক আয় কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ২৫ কোটি টাকা। গত জুনের শেষে এই ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের স্থিতি কমেছে। গত ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়ায় ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। গত জুনের শেষে এই পরিমাণ ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি কমেছে ৩ হাজার ৭২৯ কোটি টাকার কাছাকাছি।
এর ফলে দেখা যাচ্ছে, সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবর্তে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার দিকে যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছে সরকার।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়েও বড় ধরনের পতন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট সময়ে ভ্যাট আদায় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
ভ্যাট আদায় কমার পেছনে জমা দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তনকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসে ভ্যাট জমা দিতে হতো। পরে তিন মাস পরপর ভ্যাট জমা দেওয়ার নিয়ম চালু করা হয়। এতে নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি হিসাবে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে সরকার আবার মাসভিত্তিক ভ্যাট জমা দেওয়ার নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে। মাসভিত্তিক ভ্যাট জমার ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রবাহ কিছুটা নিয়মিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকার সাধারণত রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের অর্থের জোগান দেয়। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হলে বাজেটের ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। চলতি অর্থবছরের শুরুতে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
তবে সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম থাকায় ব্যাংকগুলোতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে সরকার বেশি ঋণ নিলেও তাৎক্ষণিকভাবে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তিতে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়লে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করা হয়েছে। রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া, ভ্যাট আদায়ে পতন এবং বেসরকারি খাতে ঋণের নিম্ন প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারের ব্যাংকনির্ভরতা আগামী মাসগুলোতে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিই এখন নজর রাখার বিষয়।
পড়ুন:টিসিবির কার্ডে কারা অগ্রাধিকার পাবেন, জানাল সরকার
ইমি/


