কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে নতুন প্রজন্মের ‘জেমিনি ৪’ মডেলের ঘোষণা দিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। একই সঙ্গে ‘আর্গন’ নামে একটি নতুন এআই মডেল উন্মোচন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গুগলের দাবি, আর্গন এখন পর্যন্ত তাদের তৈরি সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল। জটিল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কাজের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে মডেলটি।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো থেকে আর্গন মডেলের ঘোষণা দেওয়া হয়। গুগলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগের উন্নত ‘প্রো’ মডেলগুলোর তুলনায় আর্গন আকারে বড় এবং এর সক্ষমতাও বেশি। বিশেষ করে কোড লেখা, জটিল সমস্যা সমাধান ও সাইবার নিরাপত্তার মতো প্রযুক্তিনির্ভর কাজে মডেলটির কার্যকারিতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গুগলের ভাষ্য অনুযায়ী, কোডিং ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত কয়েকটি পরীক্ষায় আর্গন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের উন্নত মডেলগুলোর সঙ্গে তুলনীয় ফল করেছে। এআই খাতে বর্তমানে ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগলের মধ্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। নতুন আর্গন মডেলের মাধ্যমে সেই প্রতিযোগিতায় গুগল নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে।
তবে ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনই সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য আর্গন উন্মুক্ত করছে না গুগল। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্বাচিত সাইবার নিরাপত্তা অংশীদারদের কাছে মডেলটি সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতিতে মডেলটির সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করা হবে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য আর্গন কবে উন্মুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানায়নি গুগল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন এআই মডেল প্রকাশের আগে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের স্বেচ্ছামূলক কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছে গুগল। নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব ও ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টি বর্তমানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই ধারাবাহিকতায় আর্গনকেও বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গুগলের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতে ব্যবহৃত কয়েকটি মানদণ্ডে আর্গন প্রতিদ্বন্দ্বী কিছু মডেলের তুলনায় ভালো ফল করেছে। তবে সব পরীক্ষায় মডেলটি এগিয়ে নেই। বিশেষ করে কোডিং-সংক্রান্ত চারটি পরীক্ষার মধ্যে দুটিতে আর্গনের ফল প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর তুলনায় পিছিয়ে ছিল। ফলে নতুন মডেলটি কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখালেও সব ধরনের কাজে একই মাত্রার পারফরম্যান্স দেখাতে পারেনি।
এদিকে গুগল জেমিনি ৩.৫ প্রো মডেল প্রকাশের পরিকল্পনা বাতিল করেছে বলেও জানা গেছে। এর আগে গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই জানিয়েছিলেন, জেমিনি ৩.৫ প্রো জুনে প্রকাশ করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে মডেলটি বাজারে আসেনি। পরবর্তী সময়ে মডেলটি প্রকাশের পরিকল্পনাও আর এগোয়নি।
জেমিনি মডেল নিয়ে গুগলের পরিকল্পনার এই পরিবর্তনের সময় প্রতিষ্ঠানটির এআই গবেষণাগার ডিপমাইন্ডেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ডিপমাইন্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডেমিস হাসাবিস দায়িত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এনেছেন। একই সময়ে জেমিনি মডেলের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন। এসব পরিবর্তনের ফলে গুগলের এআই উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে প্রযুক্তি খাতে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই তাদের শীর্ষ এআই মডেলগুলোর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছে। গুগলের জেমিনি মডেল প্রকাশে কয়েক মাসের বিলম্বের কারণে প্রযুক্তি খাতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে—এমন আলোচনা শুরু হয়। তবে গুগলের প্রধান নির্বাহী সুন্দর পিচাই গত জুলাইয়ে এ ধরনের ধারণার বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এআই প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ে আস্থা প্রকাশ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে গুগল শুধু এআই মডেলের অত্যাধুনিক সক্ষমতার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছে না, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলের তুলনায় কম খরচে এসব প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আনছে। এআই মডেলের সক্ষমতার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয়ও বর্তমানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য হয়ে উঠেছে। ফলে শক্তিশালী মডেল তৈরির পাশাপাশি সেগুলোকে তুলনামূলক কম খরচে ব্যবহারযোগ্য করার দিকে গুগলের নজর রয়েছে।
নতুন জেমিনি ৪ ও আর্গন মডেলের ঘোষণা তাই গুগলের এআই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে প্রতিষ্ঠানটি আরও শক্তিশালী ও জটিল কাজ করতে সক্ষম মডেল তৈরির চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সেগুলোর নিরাপত্তা, ব্যবহারিক সক্ষমতা ও ব্যয় কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে। আর্গন বর্তমানে সীমিত পর্যায়ে পরীক্ষামূলক ব্যবহারে থাকায় সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এর কার্যকারিতা কতটা সফল হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে আর্গনের ঘোষণা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার—এআই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন কেবল নতুন মডেল প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কোডিং, সাইবার নিরাপত্তা, জটিল সমস্যা সমাধান, ব্যবহার ব্যয় এবং নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে মডেলগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছে। গুগলের নতুন উদ্যোগ সেই প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করতে পারে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য আর্গন উন্মুক্ত হওয়ার পর এর প্রকৃত সক্ষমতা ও প্রতিদ্বন্দ্বী মডেলগুলোর সঙ্গে পারফরম্যান্সের পার্থক্য আরও পরিষ্কার হবে।
পড়ুন:সাদ-সোহেলের নাইটক্লাবের ছবি নিয়ে তোলপাড়
ইমি/


