জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই পাইকারি বাজারে বাড়ল চালের দাম

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের চালের বাজারে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন দরে কেনা চাল বাজারে আসার পর প্রথম ধাপে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়লেও খুচরা বাজারে এর প্রভাব এখনো পুরোপুরি পড়েনি।

বিজ্ঞাপন

পাইকারি ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা মোটা চালের দাম ধরনভেদে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে চিকন চালের ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি সর্বোচ্চ প্রায় ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তবে বাজারে নতুন ও পুরোনো চালের চালান একসঙ্গে থাকায় খুচরা পর্যায়ে এখনো বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

শুক্রবার রাজধানীর বাবুবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও মহাখালী এলাকার চালের বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক দোকান ও আড়তে এখনো আগের দামে কেনা চালের মজুত রয়েছে। সেই চাল বিক্রি শেষ না হওয়া পর্যন্ত খুচরা বাজারে নতুন দরের প্রভাব পুরোপুরি পড়বে না।

গত ২০ সেপ্টেম্বর এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। নতুন দরে ডিজেল প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ১১ দিন পর রাজধানীর চালের পাইকারি বাজারে নতুন দরের চাল আসতে শুরু করেছে।

যাত্রাবাড়ীর বড় চালের আড়তগুলোর একটি মেসার্স করিম রাইস এজেন্সির বিক্রয়কর্মী শাহ আলম বলেন, প্রায় ২০ দিন আগে তারা ৫০ কেজির এক বস্তা আটাশ চাল ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতেন। বর্তমানে একই চাল ২ হাজার ১৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি মোটা চালের দাম প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা বেড়েছে।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আটাশ জাতের মধ্যে সর্বনিম্ন দামের আতপ চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯৭৫ টাকায়। বাজারে আটাশ, নাজিরশাইল, পাইজামসহ বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধ চাল পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন মিল ও কোম্পানি ‘মিনিকেট’ নামে চাল বাজারজাত করছে। এসব চাল সাধারণত মেশিনে কেটে সরু ও চকচকে করা হয়।

বর্তমানে রাজধানীর খুচরা বাজারে মোটা জাতের আটাশ চাল প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চিকন চালের দাম জাতভেদে ৬৫ থেকে ৭২ টাকা পর্যন্ত। কাটারিভোগ চাল বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৯০ টাকা কেজি দরে। আর বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত চিকন চালের ক্ষেত্রে পাঁচ কেজির প্যাকেটে প্রতি কেজির দাম পড়ছে প্রায় ৯৫ থেকে ১০৫ টাকা।

শনির আখড়ার মেসার্স শফিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে আটাশ চাল ৫২ টাকা কেজিতে বিক্রি করছেন। সাধারণ ক্রেতার ক্ষেত্রে দাম ৫৫ টাকা হলেও বেশি পরিমাণে কিনলে কিছুটা কম দামে দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, পাইকারি বাজারে আটাশ চালের বস্তাপ্রতি দাম প্রায় ১৫০ টাকা এবং চিকন চালের দামও একইভাবে বেড়েছে।

নতুন দরে চাল কিনলেও খুচরা বাজারে দাম বাড়াননি বলে জানান শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, নতুন দরে কেনা চালের কারণে প্রতি কেজিতে তার খরচ প্রায় তিন টাকা বেড়েছে। কিন্তু দোকানে আগের দামে কেনা চাল মজুত থাকায় এখনই দাম বাড়াচ্ছেন না। এতে আগের তুলনায় তার লাভ কমে গেছে।

মহাখালী কাঁচাবাজারের মেসার্স মানিক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মানিক মিয়াও একই ধরনের কথা জানিয়েছেন। তার দোকানে থাকা চালের মজুত দিয়ে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন চলবে। তাই এর মধ্যে খুচরা দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই বলে জানান তিনি। নতুন দরে চাল কিনলে পরবর্তী সময়ে সেই অনুযায়ী বিক্রি করবেন বলেও জানান।

শনির আখড়ার আরেক দোকানি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বর্তমানে তিনি আটাশ চাল প্রতি কেজি ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৭০ টাকা, পাইজাম ৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল ৯০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। তার ভাষ্য, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেও এলাকায় প্রতিযোগিতার কারণে একসঙ্গে এক-দুই টাকা দাম বাড়ানো কঠিন। তাই আপাতত আগের দামেই চাল বিক্রি করছেন। এতে অবশ্য লাভ কমে গেছে।

মহাখালী কাঁচাবাজারের শিমু ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী আজিজুর রহমান জানান, তাদের দোকানে গুটি স্বর্ণা চাল প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তিনিও জানান, পাইকারি বাজারে দাম বাড়লেও খুচরা বাজারে এর পুরো প্রভাব এখনো আসেনি।

পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, চালের দাম একবারে বড় আকারে বাড়ে না। পরিবহন খরচ, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে দাম পরিবর্তিত হয়। বাবুবাজারের চাঁদপুর ট্রেডার্সের ব্যবসায়ী আলিফ হোসেন বলেন, বর্তমানে চালের দর এখনো স্থির হয়নি। পরিবহন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা, আবার কোথাও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

তার মতে, সব ব্যবসায়ী একই হারে দাম বাড়াচ্ছেন না। ক্রেতা ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিভিন্ন আড়তে ভিন্ন ভিন্ন দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। ফলে নতুন দাম কোথায় গিয়ে স্থির হবে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

বাবুবাজারের আরেক ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সিকদার জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে একটি কোম্পানির মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে ওই কোম্পানির মিনিকেট চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৩৫০ টাকা দরে। একই আড়তে কাটারিভোগের বস্তা প্রায় ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

মাঝারি মানের মিনিকেট চালের বস্তা বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য একটি কোম্পানির আটাশ চালের বস্তার দামও ১৫০ টাকা বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে।

এদিকে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কেজির প্যাকেটজাত চালের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির পাঁচ কেজির চালের প্যাকেট ৪৮০ থেকে ৫২৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খোলা চালের পাশাপাশি প্যাকেটজাত চালের দামেও ভবিষ্যতে পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়তে পারে। তবে এখনো সে ধরনের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে চালের চাহিদা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন। ফলে চালের বাজারে সামান্য মূল্য পরিবর্তনও বিপুলসংখ্যক ভোক্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঢাকা মহানগরের দৈনিক বাজারদরের তথ্যেও চালের দামের ওঠানামার চিত্র পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৭২ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এক মাস আগে এসব চালের দাম ছিল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা। আর ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একই ধরনের চাল প্রতি কেজি ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে চালের দাম নির্ধারণে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূলত পরিবহন ব্যয়ের মাধ্যমে আসছে। তবে পুরোনো মজুত শেষ হয়ে নতুন দরের চাল পুরোপুরি বাজারে আসার পর খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আপাতত পাইকারি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি শুরু হলেও খুচরা পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী আগের দামে চাল বিক্রি করছেন।

ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে চালের বাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে নতুন দরে চাল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, পাইকারি বাজারের প্রতিযোগিতা এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের পুরোনো মজুত শেষ হওয়ার ওপর। বর্তমানে বাজারে দাম বাড়ার প্রাথমিক প্রভাব স্পষ্ট হলেও ভোক্তা পর্যায়ে এর পূর্ণ প্রতিফলন এখনো দেখা যায়নি।

পড়ুন:প্রথম প্রান্তিকে দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ

ইমি/ ‎

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন