গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচকে ঘিরে উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছে মানিকগঞ্জের কালীগঙ্গা নদীর তীর। শনিবার (৩ অক্টোবর) জেলার বেউথা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে জমজমাট নৌকাবাইচ। প্রতিযোগিতা দেখতে সকাল থেকেই নদীর দুই তীরে জড়ো হন মানিকগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলার বিপুলসংখ্যক দর্শক। দুপুরের পর নদীর দুই পাড় পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুড়িগ্রামের রৌমারী, টাঙ্গাইলের নাগরপুর, পাবনার সাঁথিয়াসহ মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার চার ক্যাটাগরিতে মোট ২২টি নৌকা এবারের নৌকাবাইচে অংশ নেয়। এর মধ্যে খেল্লা-গয়ইটা ১০টি, ঘাসি-ছিপা ৫টি, ছান্দি ৪টি এবং পানসি ৩টি নৌকা ছিল। পাশাপাশি ৭০ ও ৮০ হাত দীর্ঘ দুটি কলাগাছের ভেলাও প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।
নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই কালীগঙ্গার দুই তীরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, ফরিদপুর, দোহার, নবাবগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ নদীর পাড়ে এসে জড়ো হন। কেউ নৌকায়, কেউ নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আবার কেউ বিভিন্ন উঁচু স্থানে অবস্থান নিয়ে উপভোগ করেন প্রতিযোগিতা।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কুড়িগ্রামের রৌমারীর একটি নৌকা বিশেষভাবে দর্শকদের নজর কাড়ে। আয়োজকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকালে রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নের বাগুয়ারচর গ্রাম থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে নৌকাটি মানিকগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করে। বিভিন্ন নদীপথ পাড়ি দিয়ে প্রায় তিন দিনে এটি কালীগঙ্গার বেউথা ঘাটে পৌঁছায়।
আয়োজকদের ভাষ্য, ভারতের শাল কাঠ দিয়ে তৈরি ওই নৌকাটি নির্মাণে প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে এবং এটি তৈরিতে সময় লেগেছে প্রায় এক বছর। এবারের প্রতিযোগিতাই নৌকাটির প্রথম নৌকাবাইচ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য-সচিব মাসুদ পারভেজ জানান, প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সব নৌকার জন্যই বিশেষ পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি নৌকার জন্য রয়েছে ৮ সিএফটি ফ্রিজ ও পিতলের কাপ। বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিজয়ীদের জন্য রয়েছে মোটরসাইকেল, ইলেকট্রিক বাইক ও বিভিন্ন আকারের ফ্রিজসহ আকর্ষণীয় পুরস্কার।
তিনি জানান, খেল্লা-গয়ইটা এবং ঘাসি-ছিপা বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে রয়েছে ১০০ সিসি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে রয়েছে যথাক্রমে ১৬ সিএফটি ও ১১ সিএফটি ফ্রিজ। ছান্দি ও পানসি বিভাগে প্রথম পুরস্কার হিসেবে দুটি ইলেকট্রিক বাইক, দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে দুটি ১৬ সিএফটি ফ্রিজ এবং তৃতীয় পুরস্কার হিসেবে দুটি ১১ সিএফটি ফ্রিজ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ নৌকা ও ব্যক্তিদের জন্যও রয়েছে টেলিভিশন, প্রেসার কুকার ও রাইস কুকারসহ বিভিন্ন পুরস্কার।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, ঘাসি ও খেল্লা নৌকার বাছাই পর্বের পর ছান্দি ও পানসি নৌকাগুলো সরাসরি মূল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রতিযোগিতা ঘিরে কালীগঙ্গা নদীতে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়।
নৌকাবাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবীর, জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা, পুলিশ সুপার গোলাম সারওয়ার আলমসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নৌকাবাইচ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আ তা ম জহীর আলম খান লোদীর সভাপতিত্বে এবং সদস্য-সচিব মাসুদ পারভেজের পরিচালনায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয়দের মতে, কালীগঙ্গা নদীর বেউথা ঘাটের এই ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও নদীকেন্দ্রিক ঐতিহ্যেরও একটি অংশ। প্রতি বছর এ ধরনের আয়োজনকে ঘিরে নদীর দুই তীরে মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে।
পড়ুন : সিরাজগঞ্জে যমুনার চরাঞ্চলে যুবককে পিটিয়ে হত্যা


