এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিবর্তনে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ: রেহমান সোবহান

অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসছে। চীন ও ভারতের বড় অর্থনীতির উত্থানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে এশিয়ার আঞ্চলিক সরবরাহশৃঙ্খল ও বাজারের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে হবে।

শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ তিনি এসব কথা বলেন।

রেহমান সোবহান বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন পশ্চিমা দেশগুলোর যে প্রভাব ছিল, তা কমছে। এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এ অঞ্চলের দেশগুলোর রপ্তানি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক শক্তি বেড়েছে। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ ও মূলধনের জন্য আগের মতো পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভরশীল নয়।

তিনি বলেন, বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে এশিয়া। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের বাণিজ্যেও এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও চীনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে।

এশিয়ার উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতিতেও পরিবর্তন এসেছে বলে মন্তব্য করেন রেহমান সোবহান। তার মতে, অর্থনীতি এখন কৌশলগত ও রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বায়ন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থেকে সরে যাচ্ছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রেহমান সোবহান বলেন, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো কঠিন। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যে জিডিপির নিরিখেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়ানো বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে আমদানি ও ক্রমবর্ধমান মূলধনের বড় অংশ এশিয়া থেকে আসছে। তাই এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত হতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সুবিধা হলো চীন ও ভারতের প্রতিবেশী হওয়া। আগামী এক দশকে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এবং ভারত তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের উৎপাদন খাত এ দুই দেশের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হলেও তাদের বিশাল বাজারে রপ্তানির সুযোগ এখনো যথেষ্ট কাজে লাগানো হয়নি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখীকরণে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে কৌশলগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন—দুই ক্ষেত্রেই আরও কার্যকর হতে হবে।

বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরে নয়, দেশের স্থল-ভৌগোলিক অবস্থানেও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। পদ্মা ও যমুনা সেতুর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে স্থল যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এশিয়ার ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনের কথা উল্লেখ করেন রেহমান সোবহান। তার মতে, দুই দেশের সহযোগিতা বাড়লে এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বাড়বে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশও ভূমিকা রাখতে পারে।

চীন ও ভারতের বাজার, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য এশিয়ার দিকে সরে আসার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। তাই পরিবর্তনের ধরন বুঝে এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

পড়ুন : জ্বালানি তেলের দাম বাড়তেই পাইকারি বাজারে বাড়ল চালের দাম

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন