বাংলাদেশ বেতারের জনপ্রিয় উপস্থাপক ও ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা রওনক জাহান আর নেই। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শ্যামলী সেন্ট্রাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ বেতারের শ্রোতা, সহকর্মী, বিভিন্ন শ্রোতা সংগঠন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রওনক জাহানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা শোক প্রকাশ করেন। তারা প্রয়াত এই উপস্থাপকের কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করার পাশাপাশি তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ বেতারের উপস্থাপক ফাতেমা আফরোজ সোহেলী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রওনক জাহানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ‘রওনক আপা মানেই তারুণ্য আর এক পৃথিবী বিশুদ্ধতম ইতিহাস।’ দীর্ঘদিনের সহকর্মীকে স্মরণ করে তিনি আরও লেখেন, যে ডেঙ্গুর স্লোগান দিয়ে বেতারের বিভিন্ন অধিবেশনে জনমানুষের কথা বলা হয়, সেই ডেঙ্গুতেই তাদের সতীর্থকে হারাতে হয়েছে।
ফাতেমা আফরোজ সোহেলী তার শোকবার্তায় রওনক জাহানের প্রতি সহকর্মীদের অগাধ ঋণের কথাও উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, তাদের কাছে রওনক জাহান মানেই বাংলাদেশ বেতারের সুনাম। সহকর্মীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি গভীর শোক ও বেদনা প্রকাশ করেন।
রওনক জাহান বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্ত ছিলেন। ঐতিহ্যবাহী ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘দর্পণ’-এর জনপ্রিয় উপস্থাপক হিসেবে তিনি শ্রোতাদের কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
‘দর্পণ’ বাংলাদেশ বেতারের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানগুলোর একটি। সময়ের সঙ্গে অনুষ্ঠানটির বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনার ধরনে পরিবর্তন এলেও শ্রোতাদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে রওনক জাহানের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তার সাবলীল উপস্থাপনা, স্পষ্ট উচ্চারণ ও কণ্ঠের মাধুর্য অনুষ্ঠানটিকে শ্রোতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল।
দীর্ঘ সময় ধরে ‘দর্পণ’ উপস্থাপনা করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতার সঙ্গে তার একটি নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বেতারের নিয়মিত শ্রোতাদের কাছে তার কণ্ঠ ছিল পরিচিত ও আপন। ফলে তার মৃত্যুতে শুধু সহকর্মীরাই নন, দীর্ঘদিনের শ্রোতারাও গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন।
রওনক জাহানের কর্মজীবন শুধু বাংলাদেশ বেতারের একটি অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলাদেশ বেতারের পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা হিসেবেও তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। ইংরেজি সংবাদ পাঠে তার সাবলীলতা ও কণ্ঠের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছিল।
বাংলাদেশের বেতার ও টেলিভিশনের সংবাদ ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনার সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাকে গণমাধ্যমের পরিচিত মুখে পরিণত করেছিল। বিশেষ করে ইংরেজি সংবাদ পাঠিকা হিসেবে তার কণ্ঠ দেশের অসংখ্য দর্শক-শ্রোতার কাছে পরিচিত ছিল।
সহকর্মীদের মতে, রওনক জাহানের উপস্থাপনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল তার সাবলীলতা ও স্বাভাবিক উপস্থাপনভঙ্গি। কণ্ঠের ওঠানামা, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং শ্রোতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগের ক্ষমতা তাকে দীর্ঘদিন জনপ্রিয় করে রেখেছিল। পেশাগত জীবনে দীর্ঘ সময় একই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ করে গেছেন তিনি।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হওয়ায় সহকর্মীদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি বেদনাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জনসচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তার সঙ্গে যুক্ত একজন পরিচিত কণ্ঠের ডেঙ্গুতেই চলে যাওয়া বিষয়টিকে আরও বেদনাবিধুর করে তুলেছে।
রওনক জাহানের মৃত্যুতে বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন শ্রোতা সংগঠনও শোক জানিয়েছে। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তার দীর্ঘদিনের অবদানের কথা স্মরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং পরিবারের সদস্যদের এই শোক সহ্য করার শক্তি দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।
প্রায় ৩৫ বছর ধরে ‘দর্পণ’-এর মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান উপস্থাপনা এবং বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইংরেজি সংবাদ পাঠের মাধ্যমে রওনক জাহান যে অবদান রেখে গেছেন, তা দেশের সম্প্রচার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
তার কণ্ঠে ‘দর্পণ’ শুনেছেন এমন অসংখ্য শ্রোতার স্মৃতিতে তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন। একইভাবে ইংরেজি সংবাদ পাঠের মাধ্যমে যারা তার কণ্ঠের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তাদের কাছেও রওনক জাহানের স্মৃতি অমলিন থাকবে।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ বেতার হারাল দীর্ঘদিনের একজন দক্ষ, জনপ্রিয় ও পরিচিত কণ্ঠকে। আর সহকর্মী ও শ্রোতারা হারালেন এমন একজন মানুষকে, যিনি কয়েক দশক ধরে তার কণ্ঠ ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তাদের সঙ্গী হয়ে ছিলেন। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
পড়ুন:প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় সংকুচিত, আজ বিশ্ব প্রাণী দিবস
ইমি/


