মশারি আছে, তবু ব্যবহার নেই; ঢামেকে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ হঠাৎই বেড়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে যেখানে মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম, সেখানে জুলাই থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। আগস্টে সেই চাপ আরও বাড়ে, আর সেপ্টেম্বরে এক মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ১ হাজার ৪০৩ জন। অক্টোবরের প্রথম তিন দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২৭ জন।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩ হাজার ৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৪২ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২ হাজার ১৮১ জন। আর ৫৭৯ জন নিজ দায়িত্বে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন।

শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা মেডিকেলের নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগের ৪০২, ৫০২ ও ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত এই তিনটি ওয়ার্ডেই রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও চিকিৎসাব্যবস্থা ভালো রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

তবে রোগীদের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের সংখ্যাও বেশি। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রত্যেক রোগীকে মশারি সরবরাহ করলেও নানা কারণে অনেকেই তা ব্যবহার করছেন না।

গাজীপুর থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিতে আসা ১৮ বছর বয়সী ফারহান বলেন, “আমরা গাজীপুর থাকি সেখানে বেশ কয়েকদিন জ্বর থাকার পরে গাজীপুর হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম সেখান থেকে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় ঢাকা মেডিকেলে রেফার করে।এখন আগের থেকে একটু ভালো আছি।হাসপাতালে এসেছেন আপনাদের এখানে মশারি সাপ্লাই দেয়া হয়েছে কিন্তু আপনারা কেন মশারি টানাচ্ছেন না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,হাসপাতাল দেশের থেকে মশারি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু টানানোর ব্যবস্থা পাচ্ছিনা।”

ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন আফরোজা আক্তার। তিনি বলেন, “কয়েকদিন ধরে জ্বরের পর ডেঙ্গু পরীক্ষা করলে পজিটিভ আসার পর ঢাকা মেডিকেলে এসে ভর্তি হয়ে। মুখে কোন কিছু খেতে পারছি না বমি হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। পরে ঢাকা মেডিকেলে স্যালাইন নেওয়া শুরু করি। আমার ১ লাখের নিচে নেমে এসেছিল। সেটার কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালে ওয়াশরুম গুলা অনেক নোংরা।”

মশারি থাকার পরও কেন তা টানানো হচ্ছে না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভিতরে রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি গরম। মশারি টানালে ভিতরে বাতাস প্রবেশ করে না। মশারি দিয়েছে ঠিকই কিন্তু টানানোর ব্যবস্থা তো সেরকম দেখছি না।”

নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, “আমাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ডগুলোতে সকলকে মশারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তারা মশারির ব্যবহার করছেন না।এতে তাদের সাথে যারা এটেনডেন্ট রয়েছে তাদেরও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

সেপ্টেম্বরে ভর্তি ১ হাজার ৪০৩

ঢামেকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। জানুয়ারিতে ৪৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে মাসে ৭৫ এবং জুনে ১২২ জন রোগী ভর্তি হন।

জুলাই থেকে চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। ওই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হন ৩৭২ জন। আগস্টে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪৪ জনে। সেপ্টেম্বরে এক মাসেই ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৪০৩ জন।

অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২৭ জন। এ সময়ে ৬৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন, ৩১ জন নিজ দায়িত্বে চলে গেছেন এবং ৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

সব মিলিয়ে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরে ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৮৫ জন।

তিন বছরে ভর্তি ১০ হাজারের বেশি

ঢামেকের গত তিন বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৩ হাজার ৪০৯ জন। ২০২৫ সালে ভর্তি হন ৩ হাজার ৮৮৮ জন। আর চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৮৫ জন।

২০২৪ সালে জানুয়ারিতে ৬৫, ফেব্রুয়ারিতে ২৪, মার্চে ১৮, এপ্রিলে ৩৭, মে ৪৭, জুন ৬৬, জুলাই ১৪৪, আগস্ট ৩৪৬, সেপ্টেম্বরে ৭৯৪, অক্টোবরে ৮৮২, নভেম্বরে ৬৭৮ এবং ডিসেম্বরে ৩০৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন।

২০২৫ সালে জানুয়ারিতে ৭১, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২৪, এপ্রিলে ৩৫, মে ৭২, জুন ২২৯, জুলাই ৩৯৯, আগস্ট ৫৩৪, সেপ্টেম্বরে ৬৯৬, অক্টোবরে ৭৬২, নভেম্বরে ৭৭৯ এবং ডিসেম্বরে ২৬৫ জন ভর্তি হন।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জানুয়ারিতে ৪৫, ফেব্রুয়ারিতে ২৬, মার্চে ৩০, এপ্রিলে ৪১, মে ৭৫, জুন ১২২, জুলাই ৩৭২, আগস্ট ৮৪৪, সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৪০৩ এবং অক্টোবরে ১২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছর সেপ্টেম্বরে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি

চলতি বছর ঢামেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও সেপ্টেম্বরে সর্বোচ্চ। জানুয়ারিতে দুজন, ফেব্রুয়ারিতে কেউ মারা যাননি, মার্চে দুজন, এপ্রিলে কেউ মারা যাননি, মে মাসে দুজন, জুনে একজন, জুলাইয়ে ১০ জন, আগস্টে ১০ জন, সেপ্টেম্বরে ১৩ জন এবং অক্টোবরের প্রথম তিন দিনে দুজন মারা গেছেন।

অর্থাৎ চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে মারা গেছেন ১০ জন করে।

তবে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলতি বছরের মোট মৃত্যুর সংখ্যা গত দুই বছরের তুলনায় কম। ২০২৫ সালে ঢামেকে ডেঙ্গুতে ১১৮ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ দুই বছরে এই হাসপাতালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ২১৩ জনের।

তিন বছরের মাসভিত্তিক হিসাবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সর্বোচ্চ ২৫ জন এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

বর্তমানে ঢামেকে ভর্তি ২৯৮

৩ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ঢামেকে ডেঙ্গু নিয়ে ১২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন এবং ৩১ জন ডিওআরবিতে রাখা হয়েছে।

এই সময়ে ৪০২ ও ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে দুজন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে ঢামেকে মোট ২৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪১ জন পুরুষ, ৮৯ জন নারী এবং ৬৮ জন শিশু।

২১ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাই বেশি আক্রান্ত

চলতি বছর ঢামেকে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের বয়সভিত্তিক তথ্যেও একটি চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি রোগী ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী। এ বয়সসীমায় ভর্তি হয়েছেন ৮৬২ জন।

এর পর ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৬২২ জন এবং ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৫৬৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

এ ছাড়া ০ থেকে ১০ বছর বয়সী ৩৭৫ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩২৭ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ২০৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৯৪ জন, ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী ২৭ জন এবং ৮০ বছরের বেশি বয়সী ৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ৪২ জনের মধ্যে ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৯ জন, ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৭ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ৬ জন, ০ থেকে ১০ বছর বয়সী ৫ জন, ১১ থেকে ২০ বছর বয়সী ৫ জন, ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ৫ জন, ৬১ থেকে ৭০ বছর বয়সী ৪ জন এবং ৭১ থেকে ৮০ বছর বয়সী একজন রয়েছেন। ৮০ বছরের বেশি বয়সী কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।

ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে কি না এবং বর্তমানে রোগীদের অবস্থা কী—এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন বলেন, “ডেঙ্গু রোগী সংক্রান্ত সকল তথ্য দেওয়ার জন্য পরিচালক ডা আশরাফুল আলমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।এসব বিষয়ে তিনি সব কিছু বলতে পারবেন উপ-পরিচালক আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে জানতে পারবেন।”

ডেঙ্গু সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আশরাফুল আলমকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কাছ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পড়ুন: বাড়ছে বেকারত্ব, যুবকরা জড়াচ্ছে মাদক-জুয়া-চাঁদাবাজিতে, ভবিষ্যৎ কোথায়?

আর/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন