রাজধানীর শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণ যেন রূপ নিয়েছিল এক টুকরো আনন্দলোকে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা তিন শতাধিক শিশুসাহিত্যিকের পদচারণায় মুখর চারপাশ। আড্ডা, আলোচনা আর ছড়া-কবিতার সুরভি ছড়ানো উৎসবমুখর পরিবেশেই শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হলো ‘শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৬’। আর এই বর্ণিল আয়োজনের অন্যতম আকর্ষণীয় মুহূর্ত ছিল ‘বাবুই সেরা লেখক সম্মাননা ২০২৬’ প্রদান। যেখানে নিজের অনবদ্য সৃষ্টি ‘পাখপাখালির ছড়া’ গ্রন্থের জন্য সেরা লেখকের মুকুট পরলেন সুপরিচিত কবি ও শিশুসাহিত্যিক এনামূল হক পলাশ।
সকাল সাড়ে ৮টায় রেজিস্ট্রেশন বুথ থেকে উৎসবের ব্যাগ ও কুপন সংগ্রহের মধ্য দিয়ে দিনভর এই বৃহৎ আয়োজনের সূচনা ঘটে। এরপর বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ছড়াকার আবু সালেহ ফিতা কেটে এবং সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। আয়োজনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য ও উৎসবের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন শিশুসাহিত্য উৎসব উদযাপন কমিটির সদস্য-সচিব কাদের বাবু।
কেবল আনন্দ-উচ্ছ্বাসই নয়, শিশুসাহিত্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েও উৎসবে ছিল গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা। উদ্বোধনী পর্বের পরপরই ‘শিশুসাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ ও মূল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। গুণীজনদের উপস্থিতিতে পর্বটি পেয়েছিল ভিন্ন মাত্রা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী, গবেষক ও বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক মনসুর মুসা। কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে আলোচনা সমৃদ্ধ করেন কবি হাসান হাফিজ, শিশুসাহিত্যিক রোকেয়া খাতুন রুবী এবং শিশুসাহিত্যিক জুলফিকার শাহাদাৎ।
দিনব্যাপী উৎসবের পরতে পরতে ছড়ানো ছিল বৈচিত্র্যময় সব আয়োজন। একদিকে যেমন শিশুদের রং-তুলিতে ক্যানভাস রাঙানোর প্রতিযোগিতা চলছিল, অন্যদিকে চা-চক্রের ফাঁকে ফাঁকে জমে ওঠে দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা কবি ও লেখকদের প্রাণবন্ত ছড়া ও কবিতা পাঠের আসর। দুপুরের বিরতির ঠিক আগে লেখকদের উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার এক চমৎকার পরীক্ষা হয়ে যায় ‘তাৎক্ষণিক গল্প ও ছড়া লেখা’ প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে।
দুপুরের খাবারের পর আয়োজিত মনোজ্ঞ জাদু প্রদর্শনী উপস্থিত শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ লেখকদেরও মুগ্ধ করে। জাদুর রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় প্রবীণ ও নবীন শিশুসাহিত্যিকদের জমজমাট ছড়াপাঠের আসর।
বিকেলের অধিবেশনে অপেক্ষমান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পর্ব। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিশুসাহিত্য পাতার সম্পাদকদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর ও মুখোমুখি সংলাপে অংশ নেন তরুণ ও নবীন লেখকরা। শিশুসাহিত্যের মানোন্নয়ন এবং নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য জাতীয় পরিসরে লেখার সুযোগ সৃষ্টির বিষয়ে এ পর্বে গঠনমূলক ও সময়োপযোগী আলোচনা হয়, যা তরুণ লেখকদের দারুণভাবে উজ্জীবিত করে।
দিন গড়িয়ে যখন বিকেল ফুরিয়ে আসার পথে, তখনই আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঘোষণা করা হয় বহুল প্রতীক্ষিত ‘বাবুই সেরা লেখক সম্মাননা ২০২৬’। অন্যান্য গুণীজনদের সাথে ‘পাখপাখালির ছড়া’ গ্রন্থের জন্য সেরা লেখক হিসেবে সম্মাননা স্মারক গ্রহণ করেন কবি ও শিশু সাহিত্যিক এনামূল হক পলাশ। এ সময় সম্মাননাপ্রাপ্ত লেখকদের অনুভূতি প্রকাশ উৎসব প্রাঙ্গণে আবেগঘন ও প্রেরণাদায়ী পরিবেশের সৃষ্টি করে।
পরিশেষে সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সফল পরিসমাপ্তি ঘটে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সাহিত্য উৎসবের। আয়োজকদের কণ্ঠে ছিল একটিই গভীর প্রত্যাশা- নবীন-প্রবীণের মেলবন্ধন ও উৎসব বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের আঙিনাকে আগামীতে আরও সমৃদ্ধ, মননশীল এবং গতিশীল করে তুলবে।
পড়ুন : মাদক সেবনের ভিডিও ভাইরাল, ওয়ার্ড সেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি বহিষ্কার


