​মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে স্বাক্ষর জালিয়াতি: ডোপ টেস্টে চিকিৎসকের অজান্তেই নাম-সিল ব্যবহার

​মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগ থেকে দেওয়া একাধিক ডোপ টেস্ট রিপোর্টে স্বাক্ষর জালিয়াতির এক মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। ল্যাবের ডোপ টেস্টের রিপোর্টে চিকিৎসকের নাম, সিল ও স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক জানিয়েছেন—এসব রিপোর্টে তিনি কখনোই স্বাক্ষর করেননি। এমনকি যে বিভাগে ডোপ টেস্টের কাজ চলে, সেটি তার কর্মক্ষেত্রের আওতাভুক্তও নয়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর চিকিৎসককে না জানিয়েই জালিয়াতির মাধ্যমে এসব রিপোর্ট প্রস্তুত ও সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে ল্যাবের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

​প্যাথলজি বিভাগ সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজে মোট ৪৭২টি ডোপ টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি এসব রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো. আব্দুল কুদ্দুসের পাশাপাশি বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা নাজনীনের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।

​তবে ডা. তাহমিনা নাজনীন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এসবের কোনোটিতেই তার হাত নেই। মূল স্বাক্ষরের সঙ্গে রিপোর্টে থাকা স্বাক্ষরের কোনো মিল নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে তিনি মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের কাছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট মো. আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানান। ডা. তাহমিনা নাজনীন ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং এর আগে তিনি একই প্রতিষ্ঠানে লেকচারার ছিলেন। তিনি বলেন, “ডোপ টেস্টের কোনো রিপোর্টে আমি স্বাক্ষর করিনি, কারণ এটি আমার বিভাগের কাজ নয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।”

​অভিযুক্তদের অনুপস্থিতি ও নীরবতা

​অভিযোগের তীর যার দিকে, সেই ল্যাব ইনচার্জ মো. আব্দুল কুদ্দুসের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। কলেজে গিয়েও তার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি। প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত অপর ল্যাব টেকনোলজিস্ট আজমেরী আক্তারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

​অন্যদিকে, প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মৃদুল কুমার সাহা জানান, প্যাথলজি রিপোর্টে চিকিৎসকের সরাসরি স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক। তবে কোনো প্রতিবেদনে স্বাক্ষর জালিয়াতি করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে দাবি করেন।

​ল্যাবে অনিয়ম ও বহিরাগতদের উপস্থিতি

​স্বাক্ষর জালিয়াতির বাইরেও ল্যাব পরিচালনায় আরও গুরুতর অনিয়মের তথ্য মিলেছে। কোনো ধরনের নিয়োগপত্র কিংবা আউটসোর্সিংয়ের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সাগর ও মিতু নামের দুজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ল্যাবে কাজ করে আসছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, ল্যাব ইনচার্জ আব্দুল কুদ্দুসের নিজস্ব লোক হিসেবেই তারা সেখানে বহাল ছিলেন।

​এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রধান ডা. মৃদুল কুমার সাহা স্বীকার করেন, কোনো নিয়োগ ছাড়াই বহিরাগতদের দিয়ে ল্যাবে কাজ করানো অনুচিত হয়েছে। তবে কীভাবে তারা এই সুযোগ পেলেন, তা তার জানা নেই। হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম জানান, তিনি বিষয়টি জানার পর নিজে ল্যাবে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তির কাছে পরিচয় চান। সঠিক পরিচয় দিতে না পারায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের ল্যাবে আসতে নিষেধ করা হয়।

​প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন

​লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. তৌহিদুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, লিখিত অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে জালিয়াতির সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

​আইনি বিশ্লেষণ ও সম্ভাব্য শাস্তি

​আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি বা দায়িত্বশীল পদে থাকা অবস্থায় চিকিৎসকের স্বাক্ষর ও সিল ব্যবহার করে জাল রিপোর্ট তৈরি করা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

​মানিকগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবী শাকিল আহমেদ জানান, সরকারি কর্মচারীর নাম বা নথিপত্র ব্যবহার করে সরকারি দলিল জালিয়াতি করলে দণ্ডবিধির ৪৬৬ ধারা প্রযোজ্য হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। এছাড়া, প্রতারণার উদ্দেশ্যে জালিয়াতি করলে ৪৬৮ ধারা এবং জাল নথিকে আসল হিসেবে ব্যবহার করলে ৪৭১ ধারা অনুযায়ী আইনি বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে অভিযুক্তদের।

​বর্তমানে পুরো বিষয়টি কলেজের তদন্ত কমিটির অধীনে রয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই জালিয়াতিচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করছে কলেজ প্রশাসন।

পড়ুন : ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ, অনির্বাচিতদের হাতে যাচ্ছে ইউপি; বাড়ছে প্রশ্ন

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন