মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার আর দৃষ্টিনন্দন ভবন—রাজধানী ঢাকার চেহারায় উন্নয়নের ছাপ এখন দৃশ্যমান। কিন্তু চোখধাঁধানো এই পরিবর্তনের আড়ালে নাগরিক জীবনের মৌলিক সংকট যেন আরও স্পষ্ট। মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোর চাকচিক্য বাড়লেও বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান তলানিতেই রয়ে গেছে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্কের পাশেই অবস্থান করছে বাংলাদেশের রাজধানী।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) টানা ২২ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বাসযোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ করছে। প্রতিবছরই সেই সূচকে ঢাকার অবস্থান নিচের সারিতে থাকছে। সর্বশেষ প্রতিবেদনে ১৭৩টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ঢাকার পরে রয়েছে দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপলি। আর ঢাকার আগে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি, ১৭০তম অবস্থানে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার দৃশ্যমান চাকচিক্য বাড়লেও সার্বিকভাবে মানসম্মত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে বিপুল বিনিয়োগে একের পর এক বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও নাগরিকদের জীবনযাত্রার মানে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
ইআইইউ পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে বাসযোগ্য শহরের মান নির্ধারণ করে। এর মধ্যে অন্যতম অবকাঠামো। এবার এই খাতে ১০০-এর মধ্যে ঢাকা পেয়েছে ২৭ নম্বর। এর আগের চার বছর এ খাতে ঢাকার নম্বর ছিল ২৬-এর ঘরে। অবকাঠামোর এই সূচকে সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, বিদ্যুৎ-পানি এবং আন্তর্জাতিক ও টেলিযোগাযোগ সেবার মান বিবেচনা করা হয়।
দেশে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবারের রয়েছে স্মার্টফোন। এত সংখ্যক মানুষ মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ রাশেদ মেহেদী বলেন, ‘একসময় পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল আমাদের চেয়ে টেলিযোগাযোগ খাতে অনেক পেছনে ছিল। কিন্তু গত বেশ কয়েক বছর হলো তারা আমাদের থেকে এগিয়ে গেছে। আমাদের নেটওয়ার্কের উন্নয়ন ঘটানো হয়নি। ইন্টারনেটের ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের মাত্রা যেভাবে বেড়েছে, সঠিক যে নেটওয়ার্ক বানানো দরকার, স্পেকট্রাম দরকার, বিটিআরসি সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি।’
রাশেদ মেহেদী বলেন, ‘অনেক দিনের পুরোনো নেটওয়ার্ক জোড়াতালি দিয়ে চলছে। ফোরজি ইন্টারনেট সুবিধার কথা বলা হলেও এটা খুবই নিম্নমানের। কার্যত টুজির সুবিধা পাচ্ছে দেশের মানুষ। যে কারণে কথা বলতে গেলে কথা শোনা যাচ্ছে না। লাইন দুর্বল থাকছে। কোনো বিদেশি যখন এ দেশে আসে, তখন আমাদের মোবাইল নেটওয়ার্কের অবস্থা দেখে তারা বিরক্ত হয়। বিটিআরসিও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নানা কারণেই আমরা টেলিযোগাযোগ খাতে পেছনে চলে যাচ্ছি।’
অন্যদিকে ঢাকায় একের পর এক আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো তৈরি হলেও নাগরিকবান্ধব গণপরিবহনের সংকট কাটেনি। গত এক দশকে রাজধানীতে ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেলের মতো বড় পরিবহন প্রকল্প এসেছে। কিন্তু বাসযোগ্যতার সূচকে তার প্রভাব খুব একটা দৃশ্যমান হয়নি।
নগর গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ‘অনেকে মনে করতে পারেন, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে হলো; তাহলে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না কেন? আসলে অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। একদিকে মেট্রোরেলে চার লাখ মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ১০ লাখ ইজিবাইক ঢুকিয়ে ৪০ লাখ মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে ফেলা হয়েছে।’
শামসুল হক বলেন, ‘গণপরিবহনের উন্নয়ন ঘটাতে হয় ধাপে ধাপে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তরা যখন যাতায়াতের সুবিধা পাবে, তখনই বুঝতে হবে গণপরিবহনের মান বেড়েছে। কিন্তু ঢাকা শহরে কোনো আধুনিক বাসব্যবস্থা তৈরি হয়নি। অথচ আধুনিক বাসব্যবস্থা হলো গণপরিবহনের মূল মানদণ্ড। বরং বলা যায়, গত কয়েক বছরে ঢাকায় গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা অনেক বেড়েছে।’
শুধু যাতায়াত নয়, নগরবাসীর জীবনমানের অন্যতম মৌলিক বিষয় পানির মানও। ওয়াসার হিসাবে, বর্তমানে ঢাকা নগরবাসীর দৈনিক পানির চাহিদা ২৫০ থেকে ২৬৫ কোটি লিটার। ঢাকা ওয়াসার দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ২৯৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় ৩০ কোটি লিটারের বেশি পানি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। শীতলক্ষ্যা ও পদ্মা নদী থেকে পানি এনে শোধনের পর নগরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে। মেঘনা নদী থেকে পানি এনে শোধন করে সরবরাহের জন্য আরেকটি প্রকল্পের কাজও চলছে।
তবে পানির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেই যে নগরবাসীর পানির সংকট মিটছে না, তা তুলে ধরেছেন ওয়াটার এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিন জাহান। তিনি বলেন, ‘পানির উৎপাদন বাড়লেও মানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বুড়িগঙ্গার নদীর মতো দূষিত পানিও ঢাকার মানুষ ব্যবহার করে। পানির পাইপলাইনে ময়লা-আবর্জনা ঢুকে যাচ্ছে। ট্যাপে যে পানি মিলছে তা না ফুটিয়ে খাওয়া যাচ্ছে না। বস্তিবাসী চাহিদা অনুযায়ী পানি পায় না। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন এলাকায় পানির সংকট থাকে। এমনকি বোতলজাত যে পানি আমরা খাই, সেটারও মান পরীক্ষা করা হয় না। কাজেই পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে যে ঢাকাবাসী সুখে আছে, সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই।’
বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই রাজধানীবাসী। ডিপিডিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা শহরে প্রতিদিন এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। মাঝে মাঝে সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণেও বিঘ্ন ঘটে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পানি উৎপাদনে।
রাজধানীর আবাসন ব্যবস্থাও বাসযোগ্যতার মানদণ্ড পূরণে বড় বাধা হয়ে আছে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষের নিজস্ব বাসস্থান রয়েছে। ঢাকা শহরে দুই কোটি ১০ লাখ মানুষ হলে এক কোটি ৫০ লাখ মানুষ থাকছেন ভাড়া বাসায়। এর মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি বড় অংশ বসবাস করছে বস্তিতে।
মানসম্মত আবাসনের সঙ্গে শুধু একটি বাসস্থান থাকাই যথেষ্ট নয়। বাসযোগ্য নগরের জন্য খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, নির্মল বায়ু, লেক ও জলাশয়ের মতো সুযোগও প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকায় এসবের ঘাটতি রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবেই গড়ে উঠেছে রাজধানীর বড় অংশের আবাসন ব্যবস্থা। এর মধ্যেও গুলশান-বনানী, বসুন্ধরা ও উত্তরার মতো আবাসিক এলাকা রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, বিপুল বিনিয়োগের পরও ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলা যাচ্ছে না মূলত পরিকল্পনা ও নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে।
তিনি বলেন, ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পরিকল্পনায় ক্রমাগত অন্যায্য আপস, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা, আইনের প্রয়োগে সরকারি সংস্থাগুলোর অনীহা এবং জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতির কারণে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পরও ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না। এ জন্য বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকার অবস্থান আবারও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকাকে বাঁচাতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) যথাযথ বাস্তবায়ন না করে প্রভাবশালীদের চাপে বারবার সেখানে আপস করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের চাপে দুইবার ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে। পুনরায় সংশোধনের জন্য আবারও চাপ দিচ্ছে। গোষ্ঠী স্বার্থে এই পরিবর্তনগুলোই ঢাকার বাসযোগ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ।


