সাংবাদিকতার পথচলায় অনেক পালাবদল ঘটেছে। একসময় সংবাদের জন্য নির্ভর করতে হতো ডাকঘর বা টেলিগ্রামের ওপর। এখন মুহূর্তের মধ্যেই বিশ্বের যেকোনো খবর হাতের মুঠোয় চলে আসছে। ডিজিটাল যুগে তথ্যের অবাধ প্রবাহ যেমন আশীর্বাদ, তেমনি ভুয়া খবরের বিস্তার বিশাল চ্যালেঞ্জ। এই আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষকে সঠিক তথ্যটি পৌঁছে দিতে নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে নেত্রকোনার সাংবাদিক সমাজ।
সময়োপযোগী উদ্যোগে গত ৩ থেকে ৫ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত নেত্রকোনায় প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘মাল্টিমিডিয়া, এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ’।
সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তিনি আধুনিক সাংবাদিকতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটছে এবং মোবাইল সাংবাদিকতার যুগে বড় ক্যামেরার জায়গা দখল করে নিচ্ছে মাইক্রো ক্যামেরা বা অত্যাধুনিক ছোট ডিভাইসগুলো।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ আখ্যা দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, এআই-এর যুগে কোনটি পূর্ণ সত্য আর কোনটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তা যাচাই করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক ব্যস্ততা ও সমস্যা থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি গণমাধ্যমের প্রতি তার গভীর আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “কাউকে পেছনে ফেলে নয়” এই নীতিতে তিনি সবাইকে সাথে নিয়ে কাজ করতে চান। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিনিয়ত নিজেকে শোধরানোর মাধ্যমেই পেশাগত উৎকর্ষ সাধন সম্ভব।
অনুষ্ঠানে নেত্রকোনা সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মনিজা খাতুন চমৎকার ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৬ বা ২৬ বছর আগের সাংবাদিকতা আর বর্তমানের সাংবাদিকতা একেবারেই ভিন্ন। প্রযুক্তির অভাবনীয় পরিবর্তনের সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করা বর্তমানে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এ ধরনের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহ এবং প্রচারের ক্ষেত্রে দক্ষতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।
পিআইবি’র প্রশিক্ষণ সমন্বয়কারী জিলহাস উদ্দিন নিপুনের কথায় উঠে আসে এখানকার সাংবাদিকদের সম্ভাবনার কথা। নেত্রকোনার মতো লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যে সমৃদ্ধ জেলার সংবাদকর্মীরা যে কতটা আগ্রহ নিয়ে আধুনিক প্রযুক্তিগুলো শিখছেন, তা তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
প্রযুক্তির জোয়ারে গা ভাসানোর পাশাপাশি সতর্কতার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তি-নির্ভর সাংবাদিকতা আমাদের রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত উপকারী হলেও, এআই-এর অপব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুন্ন করা না হয়, সেদিকে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ম. কিবরিয়া চৌধুরী হালিম অত্যন্ত সাবলীলভাবে সাংবাদিকদের বিবর্তনের গল্পটি তুলে ধরেন। একসময় যারা হাতে লিখে বা টেলিগ্রামে খবর পাঠাতেন, তারাই এখন ইন্টারনেট, ইমেইল এবং হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করছেন। তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, এআই বা ফ্যাক্ট চেকিংয়ের অনেক কিছুই তাদের কাছে নতুন ছিল, এই তিন দিনের প্রশিক্ষণে তারা অনেক কিছু আয়ত্ত করেছেন।
নেত্রকোনার সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগত রূপান্তর সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যই ইতিবাচক। কৃষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যেন কোনোভাবেই মিথ্যা খবরের শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতেই ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের এই জ্ঞান কাজ করবে। প্রবীণের অভিজ্ঞতা আর নবীনের প্রযুক্তির সমন্বয়ে নেত্রকোনার সাংবাদিকতা আগামী দিনে আরও বস্তুনিষ্ঠ ও জনকল্যাণমুখী হয়ে উঠবে।
পড়ুন : সীতাকুণ্ডে মাদকবিরোধী র্যালি, অংশ নিলেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা


