বিদায়ী ম্যাচে মেসির জাদু, বেনিনকে ৩-০ গোলে হারাল আর্জেন্টিনা

বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও নিজের ফুটবল জাদুর ছাপ রেখে গেলেন লিওনেল মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে দুটি গোল করানোর পর নিজেও গোল করেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। মহাতারকার এমন বিদায়ী উপহারে স্মরণীয় জয় উদ্‌যাপন করেছে আলবিসেলেস্তেরা। একই ম্যাচে আকাশী-নীল জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়েছেন অভিজ্ঞ সেন্টার ব্যাক নিকোলাস ওতামেন্দি।

বিজ্ঞাপন

বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে ম্যাচজুড়ে ছিল আবেগ ও স্মৃতিকাতরতার আবহ। ম্যাচ শুরুর আগে এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসিক্ত দেখা যায় মেসিকে। তাঁর ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে ম্যাচের ১০ মিনিটে দুই মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রাখেন রেফারি। সে সময় গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকেরা দাঁড়িয়ে ‘ওলে ওলে মেসি’ স্লোগানে পুরো স্টেডিয়াম মুখর করে তোলেন। বেনিনের খেলোয়াড় ও মাঠের সহকর্মীরাও হাত মিলিয়ে ফুটবলের এই রাজপুত্রকে অভিবাদন জানান।

প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেও গোলের দেখা পায়নি আর্জেন্টিনা। বিরতির পর অবশ্য দ্রুতই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ৪৮তম মিনিটে মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে দারুণ এক ভলিতে গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। তবে গোলের মাত্র দুই মিনিট পরই অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডারকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। মাঠ ছাড়ার সময় সতীর্থ ও দর্শকদের কাছ থেকে ‘স্ট্যান্ডিং ওভেশন’ পান ওতামেন্দি।

এরপর ৫৯ মিনিটে রদ্রিগো দি পল ও জুলিয়ান আলভারেজকে তুলে নিকো পাজ ও নিকোলাস গঞ্জালেসকে মাঠে পাঠান স্কালোনি। মাঠে নামার এক মিনিটের মধ্যেই কোচের আস্থার প্রতিদান দেন নিকো পাজ। মেসির অ্যাসিস্টে নিজের প্রথম স্পর্শেই বল জালে জড়ান ২২ বছর বয়সী এই তরুণ ফরোয়ার্ড। বাম দিক থেকে মেসির বাড়ানো নিখুঁত পাস নিয়ন্ত্রণ করে বক্সের দিকে ঘুরে অসাধারণ বাঁকানো শটে লক্ষ্যভেদ করেন ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর এই তারকা।

দুটি অ্যাসিস্টের পর এবার নিজেই স্কোরশিটে নাম লেখান মেসি। ৭১ মিনিটে বেনিনের বক্সে অগাস্টিন জিয়াই ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিক নিতে বল বসিয়ে জোরাল শটে ওপরের কোণা দিয়ে লক্ষ্যভেদ করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। বেনিন গোলকিপারের ঝাঁপও ঠেকাতে পারেনি মেসির শট। জাতীয় দলের জার্সিতে এটি ছিল তাঁর ১২৬তম গোল। গোলের পর মেসিকে মাঝখানে রেখে কেন্দ্রবৃত্তে দাঁড়িয়ে উল্লাসে মেতে ওঠেন সতীর্থরা।

এরপরও গোলের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি হলেও রেফারির শেষ বাঁশির আগে আর জালের দেখা পায়নি স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত মেসির দুই অ্যাসিস্ট ও এক গোলের সুবাদে ৩-০ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। একই সঙ্গে শেষ হয় আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি নামের এক অতিমানবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অধ্যায়।

তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে আবেগের রেশ কাটেনি। বুয়েনস আইরেসের ঐতিহ্যবাহী এই স্টেডিয়ামের বিশাল গ্যালারিতে কখনো নেমে আসে নীরবতা, আবার পরক্ষণেই শোনা যায় মুহুর্মুহু করতালি। মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেসি। মুখে মৃদু হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলেও চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আকাশী-নীল জার্সিকে বিদায় জানানোর কষ্টের গভীরতাই প্রকাশ করছিল।

কোচ লিওনেল স্কালোনি, সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, এনজো ফের্নান্দেসসহ স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৮৫ হাজারেরও বেশি দর্শক মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকার বিদায়ী বক্তব্য। স্প্যানিশ ভাষায় দেওয়া ৩৯ বছর বয়সী মেসির সেই আবেগঘন বক্তব্যে জাতীয় দলের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং বিদায়ের অনুভূতি উঠে আসে।

বিদায়ী ভাষণের শুরুতেই জাতীয় দলের প্রতি নিজের ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘ফিরে না আসাটা খুবই কষ্টদায়ক হবে। আমি শপথ করে বলতে পারি, জাতীয় দলের হয়ে খেলা একজন খেলোয়াড় জীবনের ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর ঘটনাগুলোর একটি। মনের মধ্যে এত আবেগ কাজ করছে যে কিছু বলা কঠিন। প্রথমেই আমার বাবার কথা মনে পড়ছে। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জার্সি পরতে পারা আমার জন্য ছিল এক বিরাট সম্মানের বিষয়। সবচেয়ে খারাপ সময়েও আমি কখনো লড়াই করা থামাইনি, নিজের সর্বস্ব দেওয়া থামাইনি।’

ক্যারিয়ারের সব বিশ্বজয়ী অর্জনের পেছনে সতীর্থদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন মেসি। তিনি যোগ করেন, ‘আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমাকে আমার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছে—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার, কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার, ফাইনালিসিমার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার। আমি যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত ছিলাম, কারণ জানতাম, আমার পাশে এমন যোদ্ধারা রয়েছে যারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে লড়বে।’

মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামের আবেগঘন পরিবেশ নিয়েও নিজের অনুভূতি জানান মেসি। তাঁর ভাষায়, ‘আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের দিনগুলোর একটি আমি এখানে অনুভব করেছি—বিশ্বকাপ জয়ের পর যখন আমরা আবার খেলার মাঠে ফিরেছিলাম। আর আজ আবার এখানে ফিরে এসে নিশ্চিতভাবেই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে দুঃখের দিনটি অনুভব করছি। কারণ, আজ সেই দিন, যেদিন আমি জাতীয় দল এবং তোমাদের সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি।’

ভবিষ্যতেও দলটির পাশে থাকার অঙ্গীকার করে বক্তব্য শেষ করেন মেসি। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে আমি তোমাদের সঙ্গেই থাকব—ওই পাশে গ্যালারিতে, এই ছেলেদের এবং সামনে যা কিছু আসবে, সেটার প্রতি সমর্থন জানাব। আমি যেতে চাই না, মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না… শুধু বলতে চাই, আমি তোমাদের সবাইকে ভালোবাসি। সৃষ্টিকর্তার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে জন্ম দিয়েছেন। আমি আর্জেন্টাইন হতে পেরে গর্বিত।’

মেসির ভাষণ শেষ হওয়ার পর আতশবাজির আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে বুয়েনস আইরেসের আকাশ। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরে শূন্যে তুলে নাচতে শুরু করেন। আর চোখের জল মুছে আর্জেন্টিনার জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলের অধ্যায় শেষ করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবল জাদুকর।

পড়ুন : স্বাক্ষরিত জুলাই সনদই বাস্তবায়ন করা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সা/

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

বিশেষ প্রতিবেদন